হাইড্রোগ্রাফি জরিফ ছাড়াই সন্দ্বীপ চ্যানেলে বালি উত্তোলন: বিআইডব্লিউটিএ-বন্দর মতবিরোধ
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 15 Sep, 2025
বণিক বার্তা
চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট থেকে বাঁশবাড়িয়া পর্যন্ত সন্দ্বীপ চ্যানেলে বালি উত্তোলনে ঠিকাদার নিয়োগ দিচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। এ চ্যানেলের উভয় সীমানায় নদী ও উপকূলীয় বন্দর। তাদের আপত্তি উপেক্ষা করে ঠিকাদার নিয়োগে উপকূলে ভাঙন, পরিবেশ বিপর্যয় ও সন্দ্বীপ চ্যানেলটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। চট্টগ্রাম বন্দরের সীমানা মিরসরাই পর্যন্ত বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে বালি উত্তোলনের কার্যক্রম শুরু করতে চাইলেও এ এলাকায় বন্দরের কোনো জাহাজ চলাচল ও সংরক্ষণ কার্যক্রম নেই। এতে একই মন্ত্রণালয়ের অধীন দুটি সংস্থার মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ বলছে, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূল ও দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের মধ্যবর্তী চ্যানেলের দৈর্ঘ্য ১৫ কিলোমিটারেরও কম। এ চ্যানেলে সন্দ্বীপে যাতায়াতের পাঁচটি ঘাট রয়েছে, স্থানটি মৎস্য আহরণেও গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া সীতাকুণ্ড অংশের উপকূলে বিস্তীর্ণ জাহাজ ভাঙা শিল্প রয়েছে। সরু এ চ্যানেল এমনিতে পলি জমে, ভাঙন ও দুর্যোগে প্লাবিত ও বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ চ্যানেলে নিয়মিত হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের মাধ্যমে বিভিন্ন খাল, ঘাট এলাকার ড্রেজিং ও সংরক্ষণ করে বিআইডব্লিউটিএ। কাট্টলী এলাকার রাসমণি ঘাট থেকে নোয়াখালী পর্যন্ত নৌপথটির সংরক্ষক হিসেবেও কাজ করে সংস্থাটি। এসব কার্যক্রমে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থও ব্যয় হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বালি উত্তোলনের দরপত্র ঘোষণার পর তাতে আপত্তি জানিয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। কিন্তু তাদের আপত্তি গ্রাহ্য না করে এরই মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠানকে এক বছরের জন্য ব্লক আকারে সন্দ্বীপ চ্যানেলে বালি উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। চবক চলতি বছরের ১৫ মে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে পোর্ট লিমিটের সলিমপুর থেকে বাঁশবাড়িয়া এলাকার সমুদ্র উপকূলে ব্লক-১, ২, ৩, ৪ ইজারা দরপত্রের মাধ্যমে দুটি সর্বোচ্চ ১৪ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপের সাকশন ড্রেজার দিয়ে এক বছর মেয়াদি অস্থায়ী লাইসেন্স/ইজারা দেয়ার কথা জানানো হয়। চলতি বছরের ২ জুনের মধ্যে আগ্রহীদের দরপত্র জমা দিতে বলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি রাইজিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ১ নং ব্লক ২২ লাখ ১০ হাজার টাকায়, ডিপ ডিগার্স নামের প্রতিষ্ঠানকে ২ নং ব্লক ৫৮ লাখ ৫০ হাজার, কনস্ট্রা এইচএলআইকে ৩ নং ব্লক ১ কোটি ৩০ লাখ ২৬ হাজার ১৫৩ ও এমআরআইকে ৪ নং ব্লক ১ কোটি ২৩ লাখ ৫ হাজার টাকায় বালি উত্তোলনের জন্য মনোনীত করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ চট্টগ্রামের উপপরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) নয়ন শীল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সন্দ্বীপ চ্যানেল নৌ-রুটটি বিআইডব্লিউটিএর অধীন। চট্টগ্রাম বন্দরের পোর্ট লিমিট মিরসরাই পর্যন্ত বাড়লেও তা এখনো কার্যকর নয়। সরু চ্যানেলটির উভয় পাশে দুটি নৌবন্দর ও উপকূলীয় বন্দর ঘোষণার কারণে বিআইডব্লিউটিএ নৌ-রুট পরিচালনা, নিয়মিত ও পরিমিত মাত্রায় ড্রেজিং, অবকাঠামো নির্মাণ ও ফেরি সার্ভিস পরিচালনা করে আসছে। আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করে দরপত্র আহ্বানের পর বন্দর কর্তৃপক্ষ ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়কে এরই মধ্যে আমাদের আপত্তি জানানো হয়েছে। কিন্তু আপত্তির পরও দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল না করে ঠিকাদার নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে।’
জরিপের মাধ্যমে ড্রেজিং ও বালি উত্তোলন না হলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র চ্যানেলটি ভাঙনসহ নানামুখী সংকটের মধ্যে পড়বে, এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএর এ কর্মকর্তা।
তথ্যমতে, বন্দর কর্তৃপক্ষ দরপত্র আহ্বানের পর গত ২৫ মে চট্টগ্রামে বিআইডব্লিউটিএর স্থানীয় কার্যালয় থেকে প্রধান কার্যালয়ের বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালককে এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণে চিঠি দেয়া হয়। বিআইডব্লিউটিএর তৎকালীন উপপরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) মো. কামরুজ্জামান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ চ্যানেলটি সম্পূর্ণরূপে বিআইডব্লিউটিএর সংরক্ষিত উপকূলীয় নৌপথ। ফেনী নদীর মোহনা থেকে কুমিরা চ্যানেলের উত্তর পাশের অথরিটি বয়া পর্যন্ত প্রায় ৮৫০ বর্গকিলোমিটার চ্যানেল এলাকায় বিআইডব্লিউটিএ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে প্রতি বছর হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে সম্পন্ন করে।
বিআইডব্লিউটিএ দাবি করছে, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ধারা ৫-এ ভূগর্ভস্থ বা নদীর তলদেশ থেকে বালি বা মাটি উত্তোলনের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট দুটি নির্দেশনা আছে। আইনের ধারা ৫(১) অনুযায়ী, পাম্প বা ড্রেজিং কিংবা অন্য কোনো যান্ত্রিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ মাটি বা বালি উত্তোলন করা যাবে না। ধারা ৫(২) অনুযায়ী, নদীর তলদেশ থেকে বালি বা মাটি উত্তোলনের ক্ষেত্রে নদীর যথাযথ ঢাল বজায় রেখে এবং তলদেশ সুষম স্তরে খনন করা যায় এমন সুইং ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার ব্যবহার করে বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ড্রেজিং করতে হবে। এ কারণে বিআইডব্লিউটিএর সংরক্ষিত নৌপথ ও নদীবন্দরের আওতাভুক্ত হওয়ায় বিজ্ঞপ্তিটি বাতিল করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
নথিপত্র থেকে জানা গেছে, গত ২২ জুলাই বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন। এ চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, বন্দরের বালি উত্তোলনের দরপত্রটি আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
বিআইডব্লিউটিএ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংস্থাটি হাইড্রোগ্রাফিক বিভাগের মাধ্যমে নিয়মিত সন্দ্বীপ চ্যানেল পর্যবেক্ষণ করে। বালি উত্তোলন কিংবা নৌ-রুট স্থিতিশীল রাখতে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ করে কতটুকু পলি বা বালি উত্তোলন, ড্রেজিং করতে হবে সে বিষয়ে মতামত প্রদান করে। আবার ড্রেজিং চলাকালেও জরিপ করে অবস্থা যাচাই করে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ নৌ-চ্যানেল ড্রেজিং করে বালি উত্তোলনের ইজারা দিয়ে দিচ্ছে। বারবার আপত্তি জানানোর পরও ইজারা প্রদান করায় চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ নৌ-চ্যানেলটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সীতাকুণ্ড উপকূলে ভাঙন তৈরি হলে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডসহ সন্দ্বীপ চ্যানেলের সন্নিকটে থাকা দেশের অন্যতম লাইফলাইন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কও ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিরসরাই জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ শুরু হলে ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের আওতাধীন অঞ্চল মিরসরাই পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এর মধ্যে নদীর উভয় তীরে বন্দর ও উপকূলীয় নদীবন্দর সচল থাকায় নৌ-রুট পরিচালনা, যাত্রী পারাপারের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এক্ষেত্রে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর জটিলতা নিষ্পত্তি হয়নি। সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ, চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নৌযান চলাচলেও রুটটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া সন্দ্বীপ চ্যানেলে ড্রেজিং ও বালি উত্তোলন বন্ধ রাখা উচিত বলে মনে করে বিআইডব্লিউটিএ।
বিআইডব্লিউটিএ দাবি করছে, যথাযথ জরিপ না করে শুধু একটি নির্দিষ্ট ব্লক তৈরির মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বালি উত্তোলনের জন্য নামমাত্র মূল্যে ইজারা দেয়া হলে গুরুত্বপূর্ণ সরু চ্যানেলটি হুমকির মধ্যে পড়বে। তাছাড়া সুনির্দিষ্ট শর্ত ছাড়া ইজারা দেয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বড় ড্রেজার ও বাল্কহেডগুলোর সঙ্গে পণ্য ও যাত্রীবাহী নৌযানের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হবে বলে আশঙ্কা তাদের।
সন্দ্বীপ চ্যানেলে বালি উত্তোলনে ঠিকাদার নিয়োগ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সন্দ্বীপ চ্যানেলের ড্রেজিংয়ের বিষয়টি পরে বিস্তারিত জানানো হবে।’
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

