২৫০ বছরের আমেরিকায় কার্ল মার্ক্স ও জর্জ ওয়াশিংটনের লড়াই
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 04 Jul, 2026
আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০ তম বার্ষিকী (Semiquincentennial)। আড়াইশতক আগের এই দিনে ফিলাডেলফিয়ায় যে স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, ২০২৬ সালের ৪ জুলাই এসে সেই 'আমেরিকান স্বপ্ন' এক অভূতপূর্ব আদর্শিক যুদ্ধের মুখোমুখি।
একদিকে সাউথ ডাকোটার মাউন্ট রাশমোরের পাথুরে পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উগ্র, হুঙ্কারভরা 'লাল আতঙ্ক' (Red Scare)-এর ডাক; অন্যদিকে নিউইয়র্কের সিটি হলে আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের ব্যবহৃত আড়াইশ বছরের পুরোনো ডেস্কে বসে এক নতুন মুসলিম, অভিবাসী মেয়রের সহনশীলতা ও ঐক্যের আহ্বান।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম—দ্য গার্ডিয়ান, সিবিএস নিউজ, ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস*—আমেরিকার এই ঐতিহাসিক মাইলফলককে দেখছে একটি দেশের দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী আত্মার লড়াই হিসেবে।
ট্রাম্পের চোখে ‘অভ্যন্তরীণ কমিউনিস্ট হুমকি’
আমেরিকার চার মহান প্রেসিডেন্টের (ওয়াশিংটন, জেফারসন, লিংকন ও রুজভেল্ট) বিশাল পাথুরে মূর্তির নিচে দাঁড়িয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ভাষণ দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তাকে "চরম রাজনৈতিক ও বিভাজনমূলক" হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
প্রথাগতভাবে স্বাধীনতার এই দিনটিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা জাতীয় ঐক্যের ডাক দিলেও, ট্রাম্প বেছে নিয়েছেন তীব্র দলীয় আক্রমণের পথ। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও সিবিএস নিউজ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প তাঁর ভাষণে দাবি করেন যে, আমেরিকার বর্তমান প্রধান শত্রু কোনো বিদেশি শক্তি নয়, বরং দেশের ভেতরের "কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন প্রগতিশীলরা"।
ট্রাম্প বলেন: "আমাদের দেশে কমিউনিস্ট হুমকির পুনরুত্থান ঘটছে। এটি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পার্ল হারবার বা এমনকি ১১ সেপ্টেম্বরের (9/11) সন্ত্রাসী হামলার চেয়েও আমেরিকার স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি। আপনি কার্ল মার্ক্সের প্রতি অনুগত হতে পারেন অথবা আমেরিকার প্রতি অনুগত হতে পারেন। আপনি কমিউনিস্ট হতে পারেন অথবা দেশপ্রেমিক হতে পারেন। একসাথে দুটিই হওয়া অসম্ভব।"
একই সাথে তিনি বামপন্থী মতাদর্শের অভিবাসীদের '১৭৭৬ সালের ৪ জুলাইয়ের শত্রু' আখ্যা দিয়ে তাদের প্রয়োজনে "দেশছাড়া বা নির্বাসনে" পাঠানোর প্রচ্ছন্ন হুমকি দেন এবং আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে জিততে কড়া নাগরিকত্ব আইনের ওপর জোর দেন।
ওয়াশিংটনের ডেস্কে মামদানি: "বিভেদ হলো রাজনীতির সবচেয়ে সস্তা খেলা"
ট্রাম্পের এই উগ্র জাতীয়তাবাদী ভাষণের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে নিউইয়র্কের সিটি হল থেকে বিশ্ববাসীকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আমেরিকার গল্প শোনান নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত ১১২তম মেয়র জোহরান খোমেনি মামদানি। উগান্ডায় জন্ম নেওয়া, ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট নেতা এখন আমেরিকার বামপন্থার নতুন জাতীয় মুখ।
জর্জ ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক ডেস্কে বসে, সদ্য মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়া নতুন অভিবাসীদের পাশে নিয়ে মামদানি বলেন, আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব এর সম্পদে নয়, এর সহনশীলতায়।
দ্য গার্ডিয়ান-এর বরাতে মামদানির শান্ত ও সহনশীল বক্তব্যটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। ট্রাম্পের নাম না নিয়ে তিনি বলেন: "যাঁরা ক্ষমতাবান, তাঁরা মনে করেন আমেরিকা কেবল একটি নির্দিষ্ট গায়ের রঙ বা নির্দিষ্ট উচ্চারণের মানুষের। তাঁরা চান আমরা যেন এ দেশে শুধু অতিথি হয়ে থাকার জন্য কৃতজ্ঞ থাকি। কত সংকীর্ণ আর দুর্বল তাঁদের চিন্তাভাবনা! মানুষকে একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া এবং বিভেদ তৈরি করা হলো রাজনীতির সবচেয়ে পুরোনো এবং সস্তা খেলা। কিন্তু ২৫০ বছর আগেও প্রগতির শক্তির কাছে এই বিভাজনের শক্তি পরাজিত হয়েছিল, এবারও হবে।"
মামদানি মনে করিয়ে দেন, আয়ারল্যান্ডের দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ, চীনের খাটাখাটনি করা নাবিক আর লাঞ্ছিত কালো মানুষদের হাত ধরেই আজকের আমেরিকা গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, "দেশপ্রেম মানে দেশের ভুলত্রুটিকে আড়াল করা নয়; দেশপ্রেম হলো প্রতিটি ন্যায়সংগত প্রতিবাদ আর ভিন্নমত।"
ট্রাম্পের বর্তমান জনপ্রিয়তা এবং খণ্ডিত আমেরিকা
এই দুই নেতার বিপরীতমুখী বক্তব্য আসলে আমেরিকার বর্তমান তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণকেই প্রকাশ করে। পিউ রিসার্চ সেন্টার (Pew Research Center)-এর সাম্প্রতিক জরিপ এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী আমেরিকার বর্তমান চিত্রটি নিচে তুলে ধরা হলো: ইরানে যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ক্রমাগত উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের একাংশ ক্ষুব্ধ।
বামপন্থার উত্থান : অন্যদিকে, জোহরান মামদানির নেতৃত্বে নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টদের (DSA) বড় জয় প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ করপোরেট সংস্কৃতির বাইরে আবাসন, বিনামূল্যে শিশু যত্ন এবং ধনীদের ওপর কর আরোপের মতো বাস্তবমুখী নীতি পছন্দ করছে। |
২৫০ বছর আগে যে আমেরিকা রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল, আজ ২৫০ বছর পর সেই আমেরিকা দাঁড়িয়ে আছে এক নিজের ভেতরের বিশাল ফাটলের মুখে। একদিকে ট্রাম্পের "আমেরিকা ফার্স্ট" ও বহিষ্কারের নীতি, অন্যদিকে মামদানির "সবার জন্য আমেরিকা" ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি।
এই দুই আদর্শের লড়াই-ই নির্ধারণ করবে আগামী ২৫০ বছরে আমেরিকার মানচিত্র কেমন হবে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমেরিকা কি মাউন্ট রাশমোরের পাথরের মতো কঠোর ও অনুদার হবে, নাকি ওয়াশিংটনের ডেস্কে বসা নতুন অভিবাসীদের মতো উদার ও মানবিক হবে?
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

