:

কিয়ার স্টার্মারের পতন : অস্তিত্বের সংকটে লেবার পার্টি

top-news

লন্ডন, ২২ জুন ২০২৬:

রাজনীতিতে আড়াই বছর সময় যেন এক শতাব্দীর সমান হতে পারে, যুক্তরাজ্যের সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মারের চেয়ে তা ভালো আর কে জানেন!

২০২৪ সালের জুলাই মাসে কনজারভেটিভদের দীর্ঘ ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে যিনি লেবার পার্টিকে ঐতিহাসিক এক বিজয় এনে দিয়েছিলেন, আজ সেই নেতাই চরম অপমান আর তীব্র জনরোষ মাথায় নিয়ে ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট ছাড়তে বাধ্য হলেন।

একসময়ের প্রতিশ্রুতির বরপুত্র কীভাবে এত দ্রুত ব্রিটিশ ইতিহাসের অন্যতম অজনপ্রিয় নেতায় পরিণত হলেন, তা কেবল যুক্তরাজ্যের নয়, গোটা বিশ্বের রাজনীতির জন্যই এক বিস্ময়কর অধ্যায়।

স্টার্মারের এই পতন কেবল একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক মৃত্যু নয়, বরং এটি লেবার পার্টির অভ্যন্তরে জমে ওঠা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, নীতিগত স্খলন এবং সাধারণ ব্রিটিশ জনগণের মোহভঙ্গের এক চরম বহিঃপ্রকাশ।

অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কূটনীতি—প্রায় প্রতিটি ফ্রন্টেই লেবার সরকারের ধারাবাহিক ব্যর্থতা এই পতনের মূল কারণ।

সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকরা যখন জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট, তখন অসুস্থতা ও অক্ষমতা ভাতায় সরকারের বিলিয়ন পাউন্ডের কাটছাঁট প্রগতিশীল ও শ্রমজীবী ভোটারদের চরমভাবে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এর সাথে যুক্ত হয় গাজা ইস্যুতে সরকারের বিতর্কিত অবস্থান। মানবিক সংকটের মুখেও ইসরায়েলের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন ও অস্ত্র-রপ্তানি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তে পার্টির বামপন্থী বলয় এবং বিশাল একটি ভোটব্যাংক স্টার্মারের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয় পিটার ম্যান্ডেলসন স্ক্যান্ডাল। জেফরি এপস্টাইনের সাথে ম্যান্ডেলসনের সম্পৃক্ততার খবর এবং নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়াই তাকে নিয়োগ দেওয়ার মতো ঘটনা সরকারের নৈতিক ভিতকে পুরোপুরি ধুলিস্যাৎ করে দেয়।

দলের ভেতরের এই ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি চূড়ান্তভাবে বিস্ফোরিত হয় ২০২৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে। লেবার পার্টি ৩৫টি কাউন্সিল এবং প্রায় দেড় হাজার কাউন্সিলরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক নজিরবিহীন ভরাডুবির শিকার হয়।

এই বিপর্যয় দলটির ভেতরে চলমান গৃহযুদ্ধকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। প্রায় ৯৫ জন লেবার এমপি প্রকাশ্যে দলের নেতার পদত্যাগ দাবি করে বসেন।

স্কটিশ লেবার নেতা আনাস সারওয়ারের মতো নেতারা যখন প্রকাশ্যে স্টার্মারের নেতৃত্বকে ‘বিপর্যয়কর’ বলে আখ্যা দেন, তখন থেকেই ডাউনিং স্ট্রিটের দেয়াল কাঁপতে শুরু করে।

চূড়ান্ত ধাক্কাটি আসে খোদ মন্ত্রিসভা থেকে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলির মতো শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে স্টার্মারের বিদায় কেবল সময়ের ব্যাপারে পরিণত হয়।

স্টার্মারের বিদায়ে লেবার পার্টি এখন আক্ষরিক অর্থেই এক অস্তিত্বের সংকটে নিপতিত।

দলের হাল কে ধরবেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ। জনপ্রিয়তার দৌড়ে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এগিয়ে থাকলেও, দলের ডানপন্থী অংশের প্রতিনিধি ওয়েস স্ট্রিটিং এবং ওয়ার্কিং ক্লাস ভোটারদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় অ্যাঞ্জেলা রেইনারও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন।

তবে নতুন যিনিই নেতৃত্বে আসুন না কেন, তার সামনে অপেক্ষা করছে এক পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। ইউগভের সর্বশেষ জনমত জরিপে স্টার্মারের জনপ্রিয়তা মাইনাস ৪৬ শতাংশে নেমে যাওয়ার পাশাপাশি ৭৭ শতাংশ মানুষ মনে করছেন লেবার পার্টি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

দ্য টাইমসের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই পরিস্থিতিকে "জনগণের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে ব্যর্থ হওয়ার চরম পরিণতি" হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং বিশ্লেষকরা বলছেন, কাঠামোগত এই সংকট কোনো একক নেতার পক্ষে রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়।

এই রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে যুক্তরাজ্যের আগামী নির্বাচনের ভবিষ্যৎ ক্রমেই ঘোলাটে হয়ে উঠছে। লেবার ও কনজারভেটিভ—প্রধান দুই দলের প্রতিই সাধারণ ভোটারদের তীব্র অনাস্থা তৈরি হয়েছে, যার সুযোগ নিচ্ছে ডানপন্থী ‘রিফর্ম ইউকে’ এবং বামপন্থী ‘গ্রিন পার্টি’।

নতুন লেবার নেতাকে কেবল দলের ভেতরের রক্তক্ষরণই থামাতে হবে না, বরং যুক্তরাজ্যের রুগ্ন অর্থনীতিকে টেনে তুলতে হবে এবং ভোটারদের হারানো আস্থা ফেরানোর মতো অসাধ্য সাধন করতে হবে।

২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে লেবার পার্টি যদি নিজেদের এই ভগ্নদশা কাটাতে ব্যর্থ হয়, তবে ব্রিটিশ রাজনীতি হয়তো এমন এক নতুন সমীকরণের মুখোমুখি হবে, যার জন্য ওয়েস্টমিনস্টার আদৌ প্রস্তুত নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *