গ্রিনল্যান্ড কিনতে মরিয়া ট্রাম্প: ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর ২৫% শুল্কের খড়্গ
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 20 Jan, 2026
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড কেনার জন্য তাঁর চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। এই দ্বীপটি বিক্রিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এবং ডেনমার্কের সমর্থনে সৈন্য পাঠানোয় আটটি ইউরোপীয় দেশের ওপর ধাপে ধাপে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত আমদানিশুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে এক বিশাল বাণিজ্যিক যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যাকে বাজার বিশ্লেষকরা ‘সেল আমেরিকা’ (Sell America) ট্রেড হিসেবে অভিহিত করছেন।
ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস এবং ফিনল্যান্ডের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হবে। যদি এর মধ্যে গ্রিনল্যান্ড বিক্রির বিষয়ে কোনো ‘চুক্তি’ না হয়, তবে ১ জুন থেকে এই শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, “যতক্ষণ না গ্রিনল্যান্ড ক্রয়ের বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হচ্ছে, ততক্ষণ এই শুল্ক বহাল থাকবে।”
কেন গ্রিনল্যান্ড চান ট্রাম্প?
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান এবং সেখানে থাকা বিশাল খনিজ সম্পদ (যেমন লিথিয়াম ও রেয়ার আর্থ মেটাল) মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। ট্রাম্পের মতে, “আমরা যদি এটি না কিনি, তবে চীন বা রাশিয়া এটি দখল করে নেবে।” এমনকি তিনি গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্য করার পরিকল্পনাও ব্যক্ত করেছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) নেতারা ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন স্পষ্ট জানিয়েছেন, “গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়।” তিনি সতর্ক করেছেন যে, কোনো ন্যাটো (NATO) মিত্রের ওপর আক্রমণ বা চাপ প্রয়োগ সামরিক জোটটির অস্তিত্ব বিপন্ন করতে পারে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই শুল্কের হুমকিকে ‘সম্পূর্ণ ভুল’ বলে নিন্দা করেছেন।ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইইউ পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ৯৩ বিলিয়ন ইউরো সমমূল্যের মার্কিন পণ্যে শুল্ক আরোপ এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য ইউরোপীয় বাজার সীমিত করার কথা ভাবছে।
রয়টার্স-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এই হুমকির ফলে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা মার্কিন ডলার এবং শেয়ার বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন—যাকে বলা হচ্ছে ‘সেল আমেরিকা’ ট্রেড। জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর উৎপাদন খাতে এর ফলে বড় ধরনের ধস নামতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন।
জনমত ও অভ্যন্তরীণ চাপ
সম্প্রতি রয়টার্স/ইপসোস-এর এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক গ্রিনল্যান্ড দখলের পক্ষে। অন্যদিকে, মার্কিন কংগ্রেসের অনেক সদস্যও এই ‘জবরদস্তিমূলক কূটনীতি’র বিরোধিতা করছেন। ট্রাম্প বর্তমানে দাভোস-এ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে যোগ দিতে সুইজারল্যান্ডে রয়েছেন, যেখানে তিনি ইউরোপীয় নেতাদের সাথে এ বিষয়ে মুখোমুখি হতে পারেন। বিশ্ব রাজনীতি এখন তাকিয়ে আছে যে, ট্রাম্প কি সত্যিই শুল্ক কার্যকর করবেন নাকি এটি কেবলই একটি আলোচনার কৌশল।
গ্রিনল্যান্ড ক্রয় এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকি বিশ্ব অর্থনীতিতে এক গভীর সংকটের সংকেত দিচ্ছে। এই ঘটনার সাথে সম্পর্কিত আরও কিছু নির্দিষ্ট তথ্য এবং এর সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক প্রভাব নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ঘটনার নেপথ্যে আরও কিছু তথ্য
ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক মহড়া: সম্প্রতি ডেনমার্কের নেতৃত্বে গ্রিনল্যান্ডে 'আর্কটিক এন্ডুরেন্স' (Arctic Endurance) নামক একটি সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এতে ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যসহ আটটি দেশ অংশ নেয়। ট্রাম্প এই মহড়াকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন এবং মূলত এই দেশগুলোকেই শুল্কের লক্ষ্যবস্তু করেছেন।
ইউরোপের পাল্টা ব্যবস্থা (The Big Bazooka): ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ইতিমধ্যে ৯৩ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের মার্কিন পণ্যের একটি তালিকা তৈরি করেছে, যার ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। এছাড়া ইউরোপের 'অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট' (Anti-Coercion Instrument) ব্যবহারের চিন্তাভাবনা চলছে, যা মার্কিন বিনিয়োগ এবং পরিষেবা খাতের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে।
৩. অভ্যন্তরীণ বিরোধ যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান দলের অনেক সদস্যই এই শুল্কের বিরোধিতা করেছেন। তারা মনে করেন, মিত্রদের ওপর এ ধরনের চাপ হিতে বিপরীত হতে পারে এবং এতে খোদ মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অর্থনৈতিক প্রভাবের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
গোল্ডম্যান স্যাক্স-এর মতে, ১০% শুল্ক কার্যকর হলে জার্মানির জিডিপি প্রায় ০.৩% এবং যুক্তরাজ্যের ০.২% পর্যন্ত কমে যেতে পারে। যদি শুল্ক ২৫% হয়, তবে এই ধস আরও ভয়াবহ হবে। সামগ্রিকভাবে ইউরোপীয় অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ০.১% থেকে ০.২% পর্যন্ত কমতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদী মন্দার ঝুঁকি তৈরি করবে।
বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন যে, এই বাণিজ্যিক যুদ্ধের ফলে মার্কিন ডলারের আধিপত্য কমতে পারে। বিনিয়োগকারীরা মার্কিন শেয়ার বাজার এবং ডলার থেকে অর্থ সরিয়ে সোনা (Gold) বা সুইস ফ্রাঙ্কের মতো নিরাপদ সম্পদে সরিয়ে নিচ্ছেন। রয়টার্স জানিয়েছে, সোমবার বিশ্ববাজারে সোনার দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
শুল্ক মানেই আমদানিকৃত পণ্যের দাম বৃদ্ধি। ইউরোপ থেকে আসা গাড়ি, ওষুধ, যন্ত্রাংশ এবং বিলাসবহুল পণ্যের (যেমন ফরাসি ওয়াইন বা ঘড়ি) দাম যুক্তরাষ্ট্রে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। আইএমএফ (IMF) সতর্ক করেছে যে, এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতিকে নতুন করে উসকে দিতে পারে।সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) ব্যাহত বিশেষ করে অটোমোবাইল এবং প্রযুক্তি খাতে ইউরোপীয় যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল কোম্পানিগুলো বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
জার্মান ইকোনমিক ইনস্টিটিউট (IW)-এর তথ্যমতে, ট্রাম্পের শুল্ক নীতির অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৫ সালেই যুক্তরাষ্ট্রে জার্মান কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছিল। ২০২৬ সালে এই পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হতে পারে, যা কর্মসংস্থান ও শিল্পোৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করবে।
আইএমএফ প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়ের-অলিভিয়ের গৌরিঞ্চাস সতর্ক করেছেন যে, এই 'পাল্টা-পাল্টি' শুল্ক নীতি বিশ্ব অর্থনীতির
প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.৩ কমিয়ে দিতে পারে। সংক্ষেপে, ট্রাম্পের এই গ্রিনল্যান্ড কৌশল কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষি নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

