:

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের ‘চরম লঙ্ঘন’: গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞরা

top-news

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সামরিক অভিযান এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মত দিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আইন বিশেষজ্ঞরা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ওয়াশিংটন একে ‘আত্মরক্ষা’ বলে দাবি করতে পারে, তবে আইনের দৃষ্টিতে এর কোনো ভিত্তি নেই।

জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন ও ‘আগ্রাসনের অপরাধ’ শনিবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলায় চালানো এই অভিযানকে বিশেষজ্ঞরা ১৯৪৫ সালের জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ নিষিদ্ধ।

জাতিসংঘের যুদ্ধাপরাধ আদালতের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং বিশিষ্ট আইনজীবী জেফরি রবার্টসন কেসি বলেন, “বাস্তবতা হলো আমেরিকা জাতিসংঘ সনদ ভঙ্গ করেছে। তারা ‘আগ্রাসনের অপরাধ’ (Crime of Aggression) সংঘটিত করেছে, যাকে ন্যুরেমবার্গ আদালত ‘সর্বোচ্চ অপরাধ’ (Supreme Crime) হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। এটি সব অপরাধের চেয়ে জঘন্য।”

কিংস্টন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক এলভিরা ডোমিঙ্গুয়েজ-রেডন্ডো এবং লিগ্যাল স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সুসান ব্রিউ একমত পোষণ করে জানান, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন বা আত্মরক্ষার সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া এই হামলা সম্পূর্ণ অবৈধ।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘আত্মরক্ষা’র দাবির অসারতা

যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, মাদুরো একটি ‘নার্কো-টেররিস্ট’ বা মাদক-সন্ত্রাসী সংগঠন পরিচালনা করছিলেন এবং এই অভিযান আত্মরক্ষার্থেই করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা এই যুক্তি নাকচ করে দিয়েছেন।

জেফরি রবার্টসন বলেন, “আত্মরক্ষার দাবি তখনই খাটে যখন কোনো দেশ নিশ্চিত হয় যে তাদের ওপর এখনই হামলা হতে যাচ্ছে। ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করতে যাচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। মাদুরো মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও, শুধুমাত্র সরকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে এমন আগ্রাসন আইনত অবৈধ।”

অধ্যাপক সুসান ব্রিউ যোগ করেন, “মাদক পাচারকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি ছিল—এমন কোনো প্রমাণ নেই। এমনকি ওই পাচারকারীরা যে মাদুরোর নির্দেশেই কাজ করছিল, তারও স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি।”


নিষেধাজ্ঞা ও ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার

আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করলে নিরাপত্তা পরিষদ সাধারণত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভেটো’ ক্ষমতা থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রবার্টসন বলেন, “নিরাপত্তা পরিষদ এখন একটি অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গকারী কোনো দেশ যদি ভেটো ক্ষমতার অধিকারী হয়, তবে তারা সহজেই বিচার এড়াতে পারে।”

বিপজ্জনক নজির ও ভবিষ্যৎ হুমকি

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই দায়মুক্তি বিশ্বজুড়ে বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে।

তাইওয়ান ও চীন: এই ঘটনা চীনকে তাইওয়ান দখলে উৎসাহিত করতে পারে।

রাশিয়া ও ইউক্রেন: ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ পুতিনের ইউক্রেন আগ্রাসনের মতোই একটি অপরাধ এবং এটি আগ্রাসী দেশগুলোকে আরও বেপরোয়া করে তুলবে।

যুক্তরাজ্যের অবস্থান: যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এখন পর্যন্ত ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সরাসরি নিন্দা জানাননি। তবে আইনজ্ঞরা বলছেন, ন্যুরেমবার্গ নীতির রক্ষক হিসেবে যুক্তরাজ্যের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের এই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের নিন্দা জানানো এবং সঠিক অবস্থান নেওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *