:
ব্রেকিং নিউজ

২২ বছরের রেকর্ড ভেঙে এইচএসসিতে ধস: আঁধারে ৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ

top-news

এবারের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল যেন পুরো জাতির জন্যই এক গভীর ভাবনার ও বেদনার উপলক্ষ নিয়ে হাজির হয়েছে।

দীর্ঘ ২২ বছরের শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান পেছনে ফেলে দেশের সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে পাসের হার নেমে এসেছে ইতিহাসের অন্যতম সর্বনিম্ন তলানিতে। করোনা মহামারীকালীন শিখনঘাটতির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এবার ফলাফলের সোনালী স্বপ্ন ধূসর হয়ে গেছে ৫ লাখ ৯৪ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর জন্য।

প্রকাশিত এই পরিসংখ্যান কেবল কতজন পাস করল বা করল না তার খতিয়ান নয়, এটি আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার এক নির্মম আয়না, যা একযোগে শিক্ষক, অভিভাবক ও নীতিনির্ধারকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডে সম্মিলিত পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে, যা গত বছর ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। শুধু সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর দিকে তাকালে চিত্রটি আরও বেশি উদ্বেগজনক; ২০০৪ সালের পর এই প্রথম পাসের হার নেমে এসেছে ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশে। নয়টি সাধারণ বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫ লাখ ৭ হাজার ২৮১ জনই অকৃতকার্য হয়েছেন, যা ১৯৯০ সাল থেকে পাওয়া ব্য্যানবেইসের রেকর্ড অনুযায়ী সর্বোচ্চ।

পাশাপাশি, গত আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করতে পেরেছেন। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই ফলকে কোনোভাবেই সন্তোষজনক নয় বলে স্বীকার করে নিয়েছেন এবং শিক্ষার্থীদের ঘাটতি পূরণে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

তবে এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পেছনে রয়েছে বহুমুখী ও গভীর কারণ। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী মনে করেন, করোনার ধাক্কা এবং পরবর্তী সময়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে শিক্ষাঙ্গনে তৈরি হওয়া দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা সরাসরি আঘাত হেনেছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র আর্থিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য। সচ্ছল পরিবারের সন্তানেরা মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পেলেও প্রান্তিক ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বরাবরের মতোই পিছিয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান মনে করেন, অতীতে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে অতিরিক্ত উদারতা দেখানো হয়ে থাকতে পারে, যার ফলে প্রকৃত মূল্যায়ন আড়ালে চলে গিয়েছিল। পাশাপাশি, এসএসসিতে ভালো ফলাফল করলেও দীর্ঘদিনের ইংরেজি ভীতি এবং কলেজ পর্যায়ে মানসম্মত সহায়তার অভাব এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বড় একটা অংশকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে সব সাধারণ বোর্ডেই ইংরেজির ফল বিপর্যয় এবং ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস করার লজ্জা গোটা শিক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুর দদশাকেই ফুটিয়ে তোলে।

এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদেরা সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর কিছু পথ বাতলে দিয়েছেন। যেসব প্রতিষ্ঠানে পাসের হার অত্যন্ত কম কিংবা শূন্যের কোঠায় নেমেছে, সেখানে শুধু শিক্ষার্থীদের দোষ না দিয়ে থাইল্যান্ডের আইসিইউ মডেলের মতো নিবিড় পরিচর্যা ও স্বাধীন গবেষণার মাধ্যমে কাঠামোগত দুর্বলতা খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।একই সঙ্গে শহর ও গ্রামের মধ্যকার বৈষম্য দূর করা, শিক্ষক সংকট নিরসন এবং শ্রেণিকক্ষে প্রকৃত পাসের পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তবে এর মাঝেই কিছুটা আশার আলো হয়ে এসেছে সরকারের একটি নতুন উদ্যোগ—এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া লাখ লাখ শিক্ষার্থীর মূল্যবান একটি বছর নষ্ট হওয়া রোধ করতে মাত্র এক মাসের মধ্যে বিশেষ পরীক্ষা আয়োজনের পরিকল্পনা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

তবে দুইয়ের বেশি বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্যও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক বিকল্প পথ তৈরি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। একটি জাতির মেরুদণ্ড যখন এমন হোঁচট খায়, তখন তা কেবল পরিসংখ্যানের পাতা ভারী করে না, বরং সেটি প্রতিটি সচেতন নাগরিকের হৃদয়ে এক গভীর প্রশ্ন রেখে যায়—আমাদের আগামী প্রজন্মকে আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *