'জয় বাংলা' স্লোগানকে কেন্দ্র করে পুরানা পল্টনে সিপিবির কার্যালয় অবরুদ্ধ, নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 27 Oct, 2026
সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধনে গিয়ে আটক ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলের মুক্তির পর এক বিক্ষোভ মিছিলকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকা। মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
একই সঙ্গে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রায় এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। সিপিবি নেতাদের দাবি, হামলাকারীরা যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মী পরিচয় দিয়ে এই হামলা চালিয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে পুরানা পল্টন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হামলা চলাকালে সিপিবির দুজনকে মারধর করার খবর পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান গ্রহণ করে।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
সিপিবি নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলের মুক্তির পর তাঁকে নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি পল্টন মোড়ে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হওয়ার কথা ছিল। সমাবেশে নেতা-কর্মীরা ‘জয় বাংলা, জয় সমাজতন্ত্র’ স্লোগান দিলে যুবদল ও ছাত্রদল পরিচয়ধারী ৪০ থেকে ৫০ জন লোক এতে তীব্র আপত্তি জানান। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রথমে কথা-কাটাকাটি ও পরে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
একপর্যায়ে হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয় এবং ‘আওয়ামী লীগের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। রাত ১১টার পর পরিস্থিতি শান্ত হলে তারা স্থান ত্যাগ করে।
সিপিবি নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও জুলাই আন্দোলনের ভূমিকা
হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার বলেন, "সিপিবি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পরও তাঁদের ওপর এই কাপুরুষোচিত হামলা চালানো হয়েছে। সরকারকে তাদের নিজেদের লোকজনকে সামলাতে হবে। একটি স্বাধীন রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ের সামনে এসে কীভাবে এই হামলা চালানো হয়?" তিনি প্রথমে দুই সদস্যকে পুলিশ আটকে রাখার অভিযোগ করলেও পরে গভীর রাতে ইরান মোল্লা ও সোহেল ফকির নামের ওই দুই কর্মীকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন নিশ্চিত করেন।
রাত সোয়া ১২টার দিকে কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন: "২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সিপিবির অনবদ্য ভূমিকা ছিল। ২৬ জুলাই আমরা কারফিউ ভেঙে ঢাকার রাজপথে মিছিল করেছি, ২ আগস্ট দ্রোহযাত্রা করেছি। অথচ আজ আমাদের ফ্যাসিস্ট ও পতিত সরকারের দোসর বলে অপবাদ দেওয়া হচ্ছে। যারা এসব করছে, তারা মূলত ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে।"
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, মিছিল থেকে 'জয় সমাজতন্ত্র' ও 'জয় সর্বহারা' স্লোগান দেওয়া হয়েছিল, যা হামলাকারীরা ভুল ব্যাখ্যা করেছে। তবে কেউ যদি 'জয় বাংলা' স্লোগান দিয়েও থাকে, তাও অপরাধ নয়। কারণ, ‘জয় বাংলা’ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। আওয়ামী লীগ এই স্লোগান ব্যবহার করে অনেক অন্যায় করেছে ঠিকই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে প্রগতিশীল শক্তি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ছেড়ে দেবে।
অভিযোগ অস্বীকার ছাত্রদলের, পুলিশের বক্তব্য
এই হামলার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন জানান, "সিপিবির কার্যালয়ে ছাত্রদলের কোনো নেতা-কর্মী বিক্ষোভ দেখাতে গেছেন, এমন কোনো ঘটনার বিষয়ে আমরা অবগত নই। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে কোনো নেতা-কর্মীর প্রতি এ ধরনের কোনো নির্দেশনাও নেই। আসলে বিষয়টি কী, তা আমরা খোঁজখবর নিয়ে দেখছি।"
অন্যদিকে পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল আলম হামলার ও ভাঙচুরের বিষয়টি আংশিক অস্বীকার করে বলেন, মিছিল থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগে স্থানীয় কিছু লোকজনের সঙ্গে সিপিবির নেতা-কর্মীদের বাগ্বিতণ্ডা হয়েছিল। তবে সিপিবির অফিস ভাঙচুর বা কাউকে আটক করার কোনো ঘটনা ঘটেনি।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন জানিয়েছেন, তাঁরা হামলার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত দেশবাসীকে জানাবেন।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

