:

‘আর কখনো ফিরবেন না’ শর্তে চুয়েট ছাড়লেন নতুন উপাচার্য

top-news

টানা ৩০ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অবরুদ্ধ অবস্থা, বিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ—সব মিলিয়ে এক নজিরবিহীন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সাক্ষী হলো চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের চরম ক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হলেন নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। তবে যাওয়ার আগে তাকে মেনে নিতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের দেওয়া এক কঠোর শর্ত—‘আর কোনো দিন এই ক্যাম্পাসের মাটিতে পা রাখতে পারবেন না তিনি’।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কড়া প্রহরায় শিক্ষার্থীদের ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ক্যাম্পাস ছাড়েন অসুস্থ উপাচার্য।

চুয়েটে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই বিরাজ করছে চরম অচলাবস্থা। গত ২১ সেপ্টেম্বর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্যের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই নিয়োগ মেনে নেননি। প্রিয় শিক্ষক ও সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে পরদিন থেকেই তারা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন।

এর মধ্যেই সোমবার দুপুর ১২টার দিকে কয়েকজন বহিরাগত ও অ্যালামনাই নিয়ে নতুন উপাচার্য প্রশাসনিক ভবনে প্রবেশ করলে পরিস্থিতি মুহূর্তেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে তাকে ভবন ছাড়ার সময় বেঁধে দেন। কিন্তু তিনি বের না হওয়ায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ভবনের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। শুরু হয় টানা অবরুদ্ধ অবস্থা।

ভবনের বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় ভেতরে আটকে পড়া উপাচার্যসহ অন্তত ১২ জনের অবস্থা ক্রমেই শোচনীয় হতে থাকে। গরমে ও শ্বাসকষ্টে রাতে বেশ কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন, যাদের মধ্যে একজনকে গভীর রাতে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠাতে হয়।

মঙ্গলবার সকালে মোবাইল ফোনে উপাচার্য তার অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ ও পানি না থাকায় ভেতরে সবাই অসুস্থ বোধ করছেন, অনেকের মোবাইল বন্ধ হয়ে গেছে। একপর্যায়ে তিনি নিজেও বুকে ব্যথা অনুভব করেন এবং দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

অবশেষে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে অবরুদ্ধ উপাচার্যকে উদ্ধার করতে চুয়েট ক্যাম্পাসে ছুটে যান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এবং জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। দীর্ঘ আলোচনার পর চিকিৎসার স্বার্থে উপাচার্যকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের রাজি করান তারা।

তবে উপাচার্যকে প্রশাসনিক ভবনের নিচে নামিয়ে আনার পর মাইক হাতে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি অর্ণব চূড়ান্ত ঘোষণা দেন, "আমাদের নবনিযুক্ত ভিসি যিনি লুকিয়ে এই চুয়েটে প্রবেশ করেছিলেন, আজকে তিনি জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বের হয়ে যাচ্ছেন একটা মাত্র শর্তে—উনি আর কখনো এই চুয়েটের মাটিতে পা রাখবেন না।"

এরপর পুলিশি পাহারায় উপাচার্য যখন গাড়িতে উঠছিলেন, তখন চারপাশ থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক জানান, দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকায় উপাচার্য শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং চিকিৎসকের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

উপাচার্যের এই নাটকীয় বিদায়ের মাধ্যমে চুয়েটের চলমান সংকট নতুন মোড় নিল, তবে শিক্ষার্থীদের দাবি আদায় এবং ক্যাম্পাসের ক্লাস-পরীক্ষাসহ স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম কবে নাগাদ ফিরবে, তা নিয়ে এখনও রয়ে গেছে গভীর অনিশ্চয়তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *