কুমিল্লায় স্কুল ছাত্রী তাজমিন হত্যাকান্ড: পুলিশ জানালো রহস্য: ধর্ষণের পর হত্যা
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 10 Oct, 2026
চারটি দিন মায়ের মন কেঁদেছিল অজানা আশঙ্কায়, আর একটি মেয়ের জীবন প্রদীপ নিভে গেল ঘাতকদের নিষ্ঠুরতায়। বান্ধবীর বাড়ি যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হওয়া ১৪ বছরের কিশোরী জান্নাতুল তাজমিন আর কোনো দিন ফেরে না মায়ের কোলে।
কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার নিথর দেহ উদ্ধারের এই মর্মান্তিক ঘটনা নাড়া দিয়েছে পুরো দেশকে। সপ্তম শ্রেণির এই কোমলমতি স্কুলছাত্রীর গলায় গামছা পেঁচিয়ে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা কেবল একটি অপরাধ নয়; বরং সভ্য সমাজে এক চরম অমানবিকতার নগ্ন রূপ।
যশোর থেকে কুমিল্লায় এসে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা আব্দুল আলিমের সাজানো সংসার আজ এক নিমেষে মরুভূমি।
গত ৪ অক্টোবর বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর ৭ অক্টোবর গভীর রাতে শেষবারের মতো একটি আকুতির বার্তা আসে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে—"আমাকে নিয়ে যাও।" কিন্তু গভীর ঘুমের ঘোরে থাকা বাবা বুঝতে পারেননি এটাই ছিল তার কলিজার টুকরো মেয়ের শেষ আর্তনাদ। পরদিন ভোরে ধানখেতে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশার পাশ থেকে উদ্ধার হয় তাজমিনের মুখ থুবড়ে থাকা মরদেহ। পাশেই মিলল তার ব্যবহৃত আইফোনটি, যা দিয়ে ঘাতক সুমন পালিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেনি।
চট্টগ্রাম থেকে ডিবি পুলিশের জালে ধরা পড়া এই অটোরিকশাচালক ও তার নেশাগ্রস্ত অন্ধকার জগতের শিকার হয়ে ঝরে গেল একটি সম্ভাবনাময় জীবন।
একজন কিশোরীর অবুঝ স্বপ্নগুলোকে এভাবে গলা টিপে হত্যা করার ঘটনা বিবেকবান মাত্রই হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। অপরাধী যেই হোক এবং নেপথ্যে যতই প্রভাবশালী বা সহযোগীরা থাকুক না কেন, এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি পিশাচের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, যেন ভবিষ্যতে আর কোনো তাজমিনের মায়ের বুক এভাবে খালি করার সাহস কেউ না পায়।
কুমিল্লার লালমাইয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক ধর্ষণের পর সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীকে হত্যা করেছেন বলে দাবি পুলিশের।অটোরিকশার চালক সুমন মিয়াকে (৩৫) গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যে ছাত্রীর ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করেছে পুলিশ।
শনিবার সকাল ১০টার দিকে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) পংকজ বড়ুয়া।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, গত বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর রেসকোর্স এলাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে সুমনের সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি ভাড়া করে তাজমিন। তবে পদুয়ার বাজার এলাকা থেকে শহরের দিকে না গিয়ে ভিন্ন উদ্দেশ্যে কিশোরীকে নিয়ে বিজরার দিকে রওনা হয় চালক। দীর্ঘ সময় বিভিন্ন রাস্তায় ঘুরিয়ে তাকে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি নির্জন সড়কে নেওয়া হয়। সেখানে ধর্ষণের চেষ্টা চালালে তাজমিন প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে অটোরিকশাটি সড়কের পাশের ধানখেতে কাত হয়ে পড়ে যায়। কিশোরী দৌড়ে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা চালালেও শারীরিক দুর্বলতার কারণে কাবু হয়ে পড়ে।
জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত সুমন স্বীকার করেছে, সেখানে কিশোরীকে ধর্ষণের পর নিজের গামছা গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করে সে। হত্যাকাণ্ড শেষে সে পাশের একটি পুকুরে গোসল করে এবং নিহতের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি আইফোন হাতিয়ে নেয়। মুঠোফোনটি স্থানীয় একটি ধানখেতে লুকিয়ে রেখে অটোরিকশা ফেলে রেখেই চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যায় সুমন। পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন নম্বর ধরে ছায়া তদন্ত শুরু করে পুলিশ। একপর্যায়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি এলাকা থেকে চালক সুমনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় ডিবি পুলিশ।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন পুরো ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। তাকে আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে। আদালতে অভিযুক্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসামিকে আদালতে উপস্থাপন করার পরই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। সংবাদ সম্মেলনে লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান, গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পবিত্র সরকার ও উপপরিদর্শক অর্ণবসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

