আয়ের খাতায় স্থবিরতা, খরচের পাহাড়: লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও বন্ধ কলকারখানায় ধুঁকছে দেশ
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 05 Oct, 2026
মাস শেষে বেতনের অঙ্কটা একই থাকছে, কিন্তু বাজারের ফর্দ মেলাতে গিয়ে রীতিমতো ঘাম ছুটছে সাধারণ মানুষের। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে কাঁচাবাজার—সবকিছুতেই যেন আগুন। নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামে যখন মানুষের নাভিশ্বাস, ঠিক তখনই জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দফায় দফায় দাম বৃদ্ধি যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিগত আড়াই বছরে আয়ের খাতায় কোনো নতুন যোগফল নেই, অথচ খরচের পাহাড়ে চাপা পড়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পিঠ আজ দেয়ালে ঠেকে গেছে। একদিকে ছাঁটাই আতঙ্ক, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার হাহাকার, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি—সব মিলিয়ে এক নজিরবিহীন ত্রিমুখী সংকটের আবর্তে দিন যাপন করছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এই বেহাল দশা এখন আর কেবল সাধারণ মানুষের আক্ষেপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; সরকারি দফতর এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও উঠে আসছে ভয়াবহ সব তথ্য।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের সহ্যক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে। আয়ের তুলনায় ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় বহু মানুষ বাধ্য হয়ে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন, অনেকে আবার নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছেন। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণের কারণে দেশের শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আইএমএফ সতর্ক করেছে যে, কাঠামোগত সংস্কার না হলে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থবিরতা এড়ানো প্রায় অসম্ভব।
অর্থনীতির এই ধসের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে জ্বালানি ও বিদ্যুতের নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালের শেষার্ধে যেখানে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১,৪০৪ টাকা, ২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর তা একলাফে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১,৮৩৭ টাকায়। একইভাবে ২০২৪ সালের পূর্বে প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ১১৫ টাকা থাকলেও তা এখন যথাক্রমে ১৩৫ ও ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১৪৫ টাকার অকটেন ১৬৫ টাকায় এবং ১৪০ টাকার পেট্রোল ১৬০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান হাতিয়ার ফার্নেস অয়েলের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ১২ টাকা বাড়িয়ে লিটারপ্রতি ১০৮ টাকা ৭৮ পয়সা করা হয়েছে। জ্বালানির এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুতের বিলে; বিশ্ববাজারে এলএনজির চড়া দামের প্রভাবে গ্রাহক ও পাইকারি—উভয় পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম বেড়েছে গড়ে ১৭ থেকে ২০ শতাংশ।
জ্বালানি ও বিদ্যুতের এই ভয়াবহ সংকটের চেইন রিঅ্যাকশন সরাসরি আঘাত হেনেছে দেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতে। উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া এবং গ্যাস-বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক খাতসহ শত শত কলকারখানার চাকা আজ বন্ধ। বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, বাতিল হচ্ছে একের পর এক ক্রয়াদেশ। বাধ্য হয়ে মালিকপক্ষ কারখানায় তালা ঝোলাচ্ছেন। এর নির্মম শিকার হচ্ছেন সাধারণ শ্রমিকরা।
প্রতিদিন কাজ হারাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। দেশে নতুন কোনো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না বললেই চলে; উল্টো যাদের চাকরি আছে, তারাও চরম অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন। শ্রমবাজারের এই ধস দেশের শিক্ষিত ও অশিক্ষিত যুবসমাজের মধ্যে বেকারত্বের এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।
কর্মহীন এই বিশাল জনগোষ্ঠীর হতাশা ও ক্ষোভ খুব দ্রুতই জন্ম দিচ্ছে সামাজিক অস্থিরতার। কাজ হারানো ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের বকেয়া বেতনের দাবিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ এখন শিল্পাঞ্চলগুলোর নিত্যদিনের চিত্র। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এখন তলানিতে। অভ্যন্তরীণ এই অস্থিতিশীলতা এবং কলকারখানা বন্ধের চিত্র সরাসরি আঘাত করেছে বিদেশি বিনিয়োগের (FDI) ওপর। রেটিং সংস্থাগুলোর নেতিবাচক মূল্যায়নের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগ তো করছেনই না, বরং অনেকেই পুঁজি প্রত্যাহারের পথ খুঁজছেন।
পরিসংখ্যানের এই রূঢ় বাস্তবতার বাইরে প্রতিটি ঘরে আজ বাজছে এক নীরব কান্নার সুর। ব্যয় মেলাতে না পেরে দৈনন্দিন খাদ্য তালিকা থেকে মাছ, মাংস, ডিমের মতো পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই। যাতায়াত খরচ সাশ্রয় করতে মানুষ এখন মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে কর্মস্থলে ছুটছেন।
কৃষিক্ষেত্রেও পড়েছে এর নেতিবাচক প্রভাব; চাষাবাদে ব্যবহৃত ডিজেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় ফসলের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে ভোক্তাকেই। সন্তানকে ভালো স্কুলে পাঠানো বা অসুস্থ প্রবীণ সদস্যের ভালো চিকিৎসা করানোর মতো মৌলিক অধিকারগুলো এখন সাধারণ মানুষের কাছে আকাশকুসুম বিলাসিতা।
অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সম্মিলিত মূল্যায়ন বলছে, এই দীর্ঘমেয়াদী সংকট কাটাতে হলে কেবল সাময়িক জোড়াতালি দেওয়া নীতি যথেষ্ট নয়। কলকারখানা সচল রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কঠোর হস্তে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমন করে আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

