:

কুমিল্লায় শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন হত্যার ঘটনায় ঘাতক সুমন আটক!

top-news

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত পৌনে দুটো। গভীর রাতে বাবার মুঠোফোনে বেজে উঠেছিল একটি মেসেজের সংকেত। সাথে যুক্ত করা একটি গুগল ‘লাইভ লোকেশন’। বার্তায় লেখা ছিল বাঁচার এক ব্যাকুল আকুতি—‘বাবা, আমাকে এসে নিয়ে যাও!’ ক্লান্ত বাবা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তিনি দেখতে পাননি মেয়ের সেই শেষ আর্তনাদ।

ভোরবেলা ঘুম ভেঙে ছুটে গেলেন ফোনে ভেসে থাকা সেই লোকেশন ধরে। কিন্তু পৌঁছানোর পর যা দেখলেন, তা কোনো বাবার পক্ষেই সহ্য করা সম্ভব নয়। দেখলেন, দূর থেকে পুলিশ তুলছে কাদামাখা একটি নিথর দেহ। গন্তব্যে বাবা ঠিকই পৌঁছেছেন, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।

চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার লালমাই উপজেলায়। বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়া এলাকার মাহিনিমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন একটি নির্জন ফসলি জমি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে জান্নাতুল তাজমিন (১৫) নামের এক স্কুলছাত্রীর মরদেহ। সে কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং রেনাটা লিমিটেডের কুমিল্লা রিজিওনাল সেলস ম্যানেজার আব্দুল আলীমের একমাত্র মেয়ে। তাদের গ্রামের বাড়ি যশোরের চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলায় হলেও বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারটি কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করত।

ধানক্ষেতজুড়ে মৃত্যুর আগে বাঁচার শেষ লড়াই

বৃহস্পতিবার সকালে কাঁচিকাটা-হরিশ্চর পাকা সড়কের পাশে জগতপুর উত্তরপাড়া এলাকায় একটি সবুজ রঙের সিএনজিচালিত অটোরিকশা (কুমিল্লা থ-১৩-০১১৪) উল্টে পড়ে থাকতে দেখে সন্দেহ হয় স্থানীয়দের। অটোরিকশার কিছুটা দূরে সড়কের দুই পাশের চার-পাঁচটি ধানক্ষেতজুড়ে ধানগাছগুলো দুমড়েমুচড়ে একাকার হয়েছিল।

ঘটনাস্থলের আলামত দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, অন্ধকার রাতে ঘাতকদের হাত থেকে নিজের প্রাণ বাঁচাতে মাঠজুড়ে উন্মত্তের মতো ছোটাছুটি করেছিল কিশোরী তাজমিন। ধস্তাধস্তির সেই পদচিহ্ন ধরে এগোতেই ফসলি জমির আইলে কাদায় মুখ গোঁজা অবস্থায় মেলে তার মরদেহ। গলায় প্যাঁচানো ছিল গামছা। একটু দূরে পড়ে ছিল ভ্যানিটি ব্যাগ আর অটোরিকশার ভেতরে পাওয়া যায় তাজমিনের কাপড়ের অংশবিশেষ।

কক্সবাজার থেকে ফেরা, অতঃপর সেই অন্ধকার পথ

পুলিশ ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে সে চলে যায় পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। বুধবার দুপুরে কক্সবাজার থেকে ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসে ওঠে সে।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক পৌনে ১২টায় কুমিল্লার পদুয়ার বাজার নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে তাজমিন। গায়ে গোলাপি জামা আর কাঁধে ব্যাগ নিয়ে নূরজাহান হোটেলের পশ্চিম পাশের কয়েকটি দোকানে ঘোরাঘুরি করে সে। রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে হোটেল এলাকা ত্যাগ করতে দেখা যায়। তার গন্তব্য ছিল কুমিল্লা শহরের রেসকোর্সের বাসা। কিন্তু শহরের পথে না গিয়ে কীভাবে সে গভীর রাতে নির্জন লালমাইয়ের ধানক্ষেতে পৌঁছাল, সেই রহস্যের জট খুলতে শুরু করে মরদেহের পাশে ফেলে যাওয়া দুমড়েমুচড়ে থাকা অটোরিকশাটিকে ঘিরে।

চট্টগ্রাম থেকে ঘাতক সিএনজিচালক আটক

হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা অটোরিকশাটি। তদন্তে জানা যায়, গাড়িটি ভাড়ায় চালাতেন লালমাইসংলগ্ন জয়নগর এলাকার সুমন নামের এক চালক, যিনি মূলত রাতে পদুয়ার বাজার এলাকায় যাত্রী পরিবহন করতেন। ঘটনার পরপরই গা-ঢাকা দেন সুমন।

অবশেষে শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম মহানগরীতে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত সিএনজিচালক সুমনকে আটক করে পুলিশ। কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, "ঘটনাস্থলের ধানখেতজুড়ে ধস্তাধস্তির যে চিহ্ন পাওয়া গেছে, তাতে স্পষ্ট যে মেয়েটি বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। সিএনজিচালককে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য ও মোটিভ খুব দ্রুতই উদঘাটন করা সম্ভব হবে।"

গ্রামের বাড়িতে আহাজারি, কান্না থামছে না মায়ের

ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তাজমিনের মরদেহ যশোরের ছাতিয়ানতলায় পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে মা-বাবা এখন নির্বাক। শুক্রবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। শোকে পাথর হয়ে যাওয়া তাজমিনের মা ক্ষোভ আর আহাজারি নিয়ে বলছিলেন, ‘আমার কলিজার পাখিটাই তো চলে গেল! ও যে বান্ধবীর নাম করে বের হয়েছিল, তাকে ধরলেই তো সব বের হয়ে আসবে।’

মেয়ের পাঠানো সেই লোকেশন ধরে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিলেন বাবা আব্দুল আলীম। পাথর হয়ে যাওয়া সেই বাবার শুধু একটাই আর্তি—“আমার নিষ্পাপ মেয়েটার সাথে ঠিক কী ঘটেছিল, কারা তাকে এভাবে মেরে কাদায় ফেলে দিল—আমি শুধু এই সত্যটা জানতে চাই।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *