:

শ্রম মামলা: বিচারেরর দীর্ঘসুত্রিতা, বাড়ছে হয়রানি, বাড়তি ফি আরোপে অভিযোগ

top-news

দেশের অর্থনীতি ও শিল্পায়নের প্রধান চালিকাশক্তি মেহনতি শ্রমিক শ্রেণি। দিনরাত ঘাম ঝরিয়ে তারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখলেও, নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে পদে পদে চরম বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী শ্রম আদালতে দায়ের করা যেকোনো মামলা ৬০ দিনের মধ্যে এবং অনিবার্য কারণে সর্বোচ্চ আরও ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দ্রুত ও স্বল্প খরচে বিচার পাওয়ার এই আইনি প্রতিশ্রুতি আজ এক নিষ্ঠুর প্রহসনে পরিণত হয়েছে। চাকরিচ্যুতি, বকেয়া মজুরি কিংবা ক্ষতিপূরণের আশায় আদালতের দ্বারস্থ হয়ে একজন সাধারণ শ্রমিককে চার থেকে আট বছর পর্যন্ত জুতার শুকতলা ক্ষয় করতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে চরম দীর্ঘসূত্রতা এবং  বার অ্যাসোসিয়েশনের চাপিয়ে দেওয়া  আর্থিক ফির বোঝা, যা সাধারণ শ্রমিকদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির শেষ আশাটুকুও কেড়ে নিচ্ছে।

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ১৩টি শ্রম আদালত ও ১টি আপিল ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ২২ হাজার ৭৩৭টি মামলা বিচারাধীন, যার মধ্যে ১৩ হাজার ৪০২টি মামলাই ছয় মাসের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। বিচারকের সংকট, ১৩টি শ্রম আদালতে রেজিস্ট্রারসহ ৫৮টি গুরুত্বপূর্ণ পদের শূন্যতা, সমন জারিতে বিলম্ব এবং প্রভাবশালী মালিকপক্ষের উচ্চ আদালত থেকে রিট করে স্থগিতাদেশ এনে মামলার গতি রোধ করাই এই জটের অন্যতম প্রধান কারণ।

চট্টগ্রাম শ্রম আদালতের দীর্ঘসূত্রতার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে চট্টগ্রামের দুটি শ্রম আদালতের পরিসংখ্যানে। বর্তমানে চট্টগ্রামের দুটি শ্রম আদালতে মোট ২,০৮৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রম আদালতে ১,৪৭৯টি এবং দ্বিতীয় শ্রম আদালতে ৬০৮টি মামলা ঝুলছে।

প্রথম শ্রম আদালতের রেজিস্ট্রার  দেওয়া তথ্যমতে, বিচারাধীন এই মামলাগুলোর মধ্যে ১১০টি মামলায় উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে এবং ৪৫৬টি মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচারাধীন।

দ্বিতীয় শ্রম আদালতে  ঝুলে থাকা ৬০৮টি মামলার মধ্যে গত এপ্রিলে ৬৩টি নিষ্পত্তি হয়েছে।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের (ডাইফ)  মতে, মালিকপক্ষ শ্রমিকদের পাওনাদি, নিয়োগপত্র বা কাজের পরিবেশ নিশ্চিত না করলে ডাইফ ফৌজদারি মামলা করে এবং বিরোধ মীমাংসার চেষ্টাও করে। কিন্তু আদালতে মামলা যাওয়ার পর শুরু হয় আসল ভোগান্তি।

আইন অনুযায়ী শ্রম আদালতে মামলা দায়েরের পর ৬০ দিনের মধ্যে রায় প্রদানের বিধান রয়েছে এবং উপযুক্ত কারণ সাপেক্ষে তা আরও ৯০ দিন বাড়ানো যেতে পারে।

কিন্তু বাংলাদেশ শ্রমিক সংহতি ফেডারেশন (বিএফডব্লিউএস) কর্তৃক শ্রম মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত স্মারকলিপির তথ্যমতে, বাস্তবে সমন জারির জন্যই দুই মাসের বেশি সময় পার হয়ে যায় এবং প্রতিটি ধার্য তারিখে দুই মাস বা তারও অধিক ব্যবধান রাখা হয়।

প্রতিপক্ষ হাজির হয়ে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই লিখিত জবাব দাখিলের জন্য বারবার সময় নেয়, ফলে জবাব দাখিল করতেই কখনো কখনো দুই থেকে তিন বছর সময় পার হয়ে যায়।

সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা পর্যায়ে গিয়েও বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ করা হয় এবং একতরফা রায় হয়ে গেলে তা বাতিলের আবেদন করে পুনরায় মামলার কার্যক্রম শুরু করা হয়। এর ফলে চার থেকে আট বছর ধরে মামলা চালাতে গিয়ে কর্মহীন শ্রমিকরা চরম আর্থিক ও সামাজিক সংকটে পড়েন এবং অনেকেই হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেন।

দীর্ঘসূত্রতার এই যন্ত্রণার পাশাপাশি গোদের ওপর বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে বেআইনি আর্থিক খড়্গ। শ্রম আইনের ১৩২, ১৩৩(১) এবং ২১৬(২) ধারায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা আছে, শ্রমিকের পাওনা আদায়ের দরখাস্ত বা দলিল দাখিলের ক্ষেত্রে সমন জারির ফি ব্যতীত অন্য কোনো কোর্ট ফি প্রদান করতে হবে না। অথচ, এই সুস্পষ্ট আইনের তোয়াক্কা না করে চট্টগ্রাম জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রম আদালতে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনজীবীদের ৩০ টাকা কোর্ট ফি যুক্ত ৩০০ টাকা মূল্যের বিশেষ ওকালতনামা এবং ৫ টাকার হাজিরা ফরম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সম্প্রতি বাংলাদেশ শ্রমিক সংহতি ফেডারেশন (বিএফডব্লিউএস) আইনি নোটিশ প্রেরণ করেছে। শ্রম বিধিমালার ১২০ বিধি অনুযায়ী কোনো নিবন্ধিত ট্রেড ইউনিয়নের কর্মকর্তার মাধ্যমেও বিনা খরচে মামলা পরিচালনার সুযোগ থাকলেও, এই বাধ্যতামূলক ওকালতনামা প্রথার কারণে শ্রমিকদের আইনি অধিকার মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে যে শ্রমিক আদালতের বারান্দায় কাঁদছেন, তার ওপর এই অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া আইনের চরম লঙ্ঘন।

ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথে আরেকটি বড় বাধা হলো দেশের কাঠামোগত কেন্দ্রীকরণ। পুরো দেশের জন্য মাত্র একটি শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল, যা ঢাকায় অবস্থিত। চট্টগ্রাম বা সিলেটের কোনো প্রান্তিক শ্রমিকের পক্ষে ঢাকায় এসে আপিল মামলা পরিচালনা করা আর্থিকভাবে প্রায় অসম্ভব। ফলে শ্রম আদালতে কোনো রায় মালিকপক্ষের পক্ষে গেলে শ্রমিকরা টাকার অভাবে আর আপিল করতে পারেন না।

শ্রমিকদের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও হতাশা শুধু আদালতের বারান্দাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, আইনি প্রতিকার না পেয়ে তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছেন, যা শিল্পখাতে অস্থিতিশীলতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

শ্রম আইনের ২১৬ ধারায় উল্লেখিত সময়সীমা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে দ্রুত সমন জারি এবং অযৌক্তিকভাবে বারবার সময় প্রদান বন্ধ করতে হবে। পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি শ্রম আদালতের সংখ্যা ও বিচারিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।

চট্টগ্র্রামের একাধিক আইনজীবি জানান, চট্টগ্রামের মূল আদালত ভবন থেকে শ্রম আদালত দূরে (পাঁচলাইশ) হওয়ায় অনেক আইনজীবী সেখানে নিয়মিত সময় দিতে পারেন না, যা বিচার প্রক্রিয়াকে আরও বিলম্বিত করছে। বছরের পর বছর আইনি প্রতিকার পেতে ব্যর্থ হয়ে শ্রমিকরা যখন হতাশায় নিমজ্জিত হন, তখন তারা বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামেন। এর ফলে শিল্পখাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়, ভাঙচুর ঘটে এবং দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ব্যাহত হয়। 

আদালত ভবন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা শ্রম আদালতকে চট্টগ্রামে কোর্ট বিল্ডিং এ স্থানান্তর করা হলে বিচার প্রার্থীদের হয়রানি এবং মামলার দীর্ঘ সুত্রিতা কমবে বলে মন্তব্য করেন চট্টগ্রামের সিনিয়র আইনজীবি এডভোকেট জহির উদ্দিন মাহমুদ।

এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

প্রথমত, বাংলাদেশ শ্রমিক সংহতি ফেডারেশনের স্মারকলিপির দাবি অনুযায়ী, শ্রম আইনের ২১৬ ধারায় উল্লেখিত ৬০ দিনের সময়সীমা কঠোরভাবে বাস্তবায়নে প্রশাসনিক নজরদারি বাড়াতে হবে এবং কথায় কথায় মামলার শুনানি মুলতবি করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।

ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে দ্রুত সমন জারির ব্যবস্থা করা এবং ২ থেকে ৫ বছরের পুরোনো মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, শ্রম আদালতে  ওকালতনামা ও কোর্ট ফি প্রথা অবিলম্বে বাতিল করে সাধারণ ক্ষমতাপত্র বা ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে হয়রানিহীনভাবে মামলা পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতি ব্যাপকভাবে চালু করতে হবে, যাতে শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষেরই সময় ও দুর্ভোগ কমে।

বিচারকের শূন্য পদগুলো পূরণ, আপিল ট্রাইব্যুনাল বিকেন্দ্রীকরণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের যে আশ্বাস সরকার দিচ্ছে, তা দ্রুত দৃশ্যমান করতে হবে।

একজন শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার মজুরি পরিশোধ করা যেমন নৈতিক দায়িত্ব, তেমনি তার আইনি অধিকারটি দ্রুত, বিনামূল্যে ও হয়রানিহীনভাবে নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পবিত্র সাংবিধানিক দায়। জনস্বার্থে এবং দেশের শিল্পখাতকে বাঁচিয়ে রাখতে শ্রম আদালতকে প্রকৃত অর্থেই শ্রমিকবান্ধব করে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের আইনানুগ তত্ত্বাবধান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে শ্রমিকদের আদালতমুখী আস্থা বৃদ্ধি পাবে।

একজন শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার মজুরি পরিশোধ করা যেমন নৈতিক দায়িত্ব, তেমনি তার আইনি অধিকারটি দ্রুত, বিনামূল্যে ও হয়রানিহীনভাবে নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের পবিত্র আইনি দায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *