বাংলাদেশকে ঘিরে ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ: ভারত-রাশিয়া-চীনের টার্গেট এখন বঙ্গোপসাগর!
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 06 Sep, 2026
বঙ্গোপসাগরের শান্ত নীল জলরাশি আর কেবল পণ্যবাহী জাহাজের রুট নয়, এটি রূপ নিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক স্নায়ুযুদ্ধের নতুন কুরুক্ষেত্রে।
মিয়ানমারের সংঘাতময় তানিন্থারি উপকূলে যখন রাশিয়ার প্রকৌশলীরা দাওয়াই গভীর সমুদ্রবন্দরের ব্লু-প্রিন্ট আঁকছেন, ঠিক তখন আন্দামান-নিকোবরের নিস্তব্ধ দ্বীপপুঞ্জে ভারতের সাবমেরিন ও পি-৮আই সাবমেরিন-বিধ্বংসী নজরদারি বিমানগুলো নিঃশব্দে তাক করা চীনের সমুদ্র করিডোরের দিকে।
আপাতদৃষ্টিতে যা মনে হতে পারে ভারত-চীন-রাশিয়া মিলে যুক্তরাষ্ট্রকে সাগরছাড়া করার এক যৌথ ছক, সামরিক বিশ্লেষকদের মানচিত্র বলছে হিসাবটা একদম উল্টো। বঙ্গোপসাগরের এই মহানাটকে কেউ কারও নিঃশর্ত বন্ধু নয়; এটি এমন এক বহুমুখী শক্তি-লড়াই যেখানে মস্কো খুঁজছে নিষেধাজ্ঞার বিকল্প জ্বালানি রুট, বেইজিং চাইছে মালাক্কার শ্বাসরোধ থেকে বাঁচার পথ, আর দিল্লি ও ওয়াশিংটন মিলে আন্দামানের মুখে দাঁড় করাচ্ছে এক দুর্ভেদ্য সামরিক প্রাচীর—যার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ।
মস্কো কেন হঠাৎ আন্দামান সাগরের মোহনায় নোঙর ফেলতে মরিয়া? ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় কোণঠাসা ভ্লাদিমির পুতিনের তেলের ট্যাঙ্কার ও বাণিজ্যের জন্য প্রয়োজন নতুন এক উষ্ণ সমুদ্রপথ। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে দাওয়াই বন্দরে তেল শোধনাগার, এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ার যে সমঝোতা মস্কো করেছে, তা তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরাসরি ভারত মহাসাগরের প্রবেশদ্বারে সুদৃঢ় অবকাঠামোগত ভিত্তি এনে দিচ্ছে।
কিন্তু বেইজিংয়ের নজর আরও গভীর। চীনের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হলো ‘মালাক্কা ডাইলেমা’—যেকোনো আন্তর্জাতিক সংঘাতে সুমাত্রা ও মালয়েশিয়ার মধ্যবর্তী সংকীর্ণ মালাক্কা প্রণালী অবরুদ্ধ হলেই থমকে যাবে বেইজিংয়ের জ্বালানি সরবরাহ। সেই ফাঁদ কাটাতে চীন মিয়ানমারের কিয়াকফিউ বন্দর ও চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের মাধ্যমে ইউনান প্রদেশ থেকে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে পাইপলাইন নামিয়ে আনছে। ফলে মস্কো ও বেইজিং হাত মিলিয়ে একজোট হয়ে নামেনি, বরং তারা একই সাগরে নেমেছে নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ হাসিল করতে।
এই আগ্রাসী কৌশলের বিপরীতে ভারতের অবস্থান একদম স্পষ্ট। দিল্লি খুব ভালো করেই জানে, কিয়াকফিউ বা দাওয়াই বন্দরের বিস্তার মানেই ভারতের ঘরের দরজায় চীনের ‘মুক্তোর মালা’ বা স্ট্রিং অব পার্লস পেঁচিয়ে যাওয়া। ফলে ভারত-চীন বঙ্গোপসাগরে কোনো যৌথ বলয় নয়, বরং চূড়ান্ত মুখোমুখি অবস্থানে।
আন্দামান ও নিকোবর কমান্ডকে ভারত এখন পরিণত করেছে বঙ্গোপসাগরের এক ‘ডুবে না এমন যুদ্ধজাহাজে’। মালাক্কা প্রণালীর ঠিক মুখ থেকে মাত্র ১০০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থিত আইএনএস বাজ ও আইএনএস কোহাসা নৌঘাঁটির রানওয়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ওঠানামার জন্য। গ্রেট নিকোবরে আধুনিক নৌঘাঁটি ও গোপন সাবমেরিন ডক নির্মাণের মাধ্যমে ভারত বার্তা দিয়েছে—সংকটের মুহূর্তে মালাক্কার প্রবেশমুখ সিলগালা করে দেওয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দিল্লির হাতে। আর এই পদক্ষেপে ভারতের প্রধান কৌশলগত অংশীদার কোনো মস্কো নয়, বরং ওয়াশিংটন, টোকিও ও ক্যানবেরার সমন্বয়ে গড়া ‘কোয়াড’ জোট।
পেন্টাগনের ইন্দো-প্যাসিফিক পরিকল্পনা কি তবে সত্যিই ভেস্তে গেছে বা ওয়াশিংটন কি কোণঠাসা?
পশ্চিমা সামরিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা বলছে ভিন্ন কথা। যুক্তরাষ্ট্র মোটেও পিছু হটছে না; বরং তারা সামরিক ঘাঁটির চেয়ে আরও বাস্তবমুখী ‘কৌশলগত বন্দর অংশীদারিত্ব’ গড়ে তুলছে। কোয়াডের ‘পোর্টস অব দ্য ফিউচার পার্টনারশিপ’-এর চোখ এখন সরাসরি বঙ্গোপসাগরের বন্দরগুলোতে।
জাপানের বিপুল অর্থায়নে গড়ে ওঠা মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর আজ কেবল একটি বাণিজ্যিক টার্মিনাল নয়, এটি ইন্দো-প্যাসিফিক সাপ্লাই চেইনের এক নতুন মেরুদণ্ড। মাতারবাড়ি নিয়ে একই টেবিলে বসে হিসেব কষছে টোকিও, ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলস। ইউরোপীয় ইউনিয়নও দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে যে ঐতিহাসিক অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি সম্পন্ন করেছে, তার মূল লক্ষ্য এই ভূ-কৌশলগত অঞ্চলটিকে বেইজিংয়ের একচ্ছত্র কব্জায় যেতে না দেওয়া।
ওয়াশিংটনের চোখে ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়ার বিকল্প হিসেবে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী যেকোনো নিরাপদ লজিস্টিক হাব হতে পারে তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক টিকে থাকার তুরুপের তাস।
এই মহাজাগতিক দাবার বোর্ডের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিন্দুতে এখন দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রজয়ের পর ঢাকা কেবল জলসীমা বাড়ায়নি, বরং নিজেকে এনে দাঁড় করিয়েছে পরাশক্তিদের নিশানায়। নেপাল, ভুটান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর লাইফলাইন হিসেবে চট্টগ্রাম, মোংলা ও মাতারবাড়ি মিলে যে সামুদ্রিক ত্রিভুজ গড়ে উঠেছে, তা একইসঙ্গে সমৃদ্ধি ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণ।
ট্রাম্প প্রশাসনের মতো কঠোর বাণিজ্যিক নীতির যুগে কোনো দেশ যদি বেইজিংয়ের সামরিক তৎপরতাকে পরোক্ষ সহায়তা দিচ্ছে বলে সন্দেহ তৈরি হয়, তবে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক অবরোধের খাঁড়া নেমে আসতে পারে।
আর্ন্তজার্তিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চারপাশের পরাশক্তিরা যখন পরস্পরের দিকে চোখ রাঙাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের সামনে কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। এই উত্তপ্ত সমুদ্রে পুতিনের তেল, শি জিনপিংয়ের করিডোর কিংবা ওয়াশিংটনের কোয়াড দেয়াল—কোনো একক সামরিক ফাঁদে পা না দিয়ে নিজস্ব অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি চালানোই হবে ঢাকার টিকে থাকার একমাত্র শর্ত।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

