সার সংকট : কৃষি ও সমৃদ্ধির পথে চ্যালেঞ্জ
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 25 Apr, 2026
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান কারিগর আমাদের কৃষকরা। আর সেই কৃষির প্রাণভোমরা হলো ইউরিয়া সার। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ গ্যাস সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সার সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার বসে নেই; প্রথাগত উৎসের বাইরে নতুন নতুন দেশ থেকে সার আমদানির জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশে ইউরিয়া সারের মোট চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ লাখ ২২ হাজার টন। এর মধ্যে জুলাই মাস থেকে শুরু হতে যাওয়া আমন মৌসুমেই প্রয়োজন হবে ৬ লাখ ৬৫ হাজার টন। বর্তমানে দেশে সারের মজুদ রয়েছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার টন। যদিও ৪ লাখ টন মজুদকে ‘নিরাপদ সীমা’ ধরা হয়, তবে সরকার এই ঘাটতি দ্রুত পূরণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সার সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু করেছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে দেশের পাঁচটি বড় কারখানার মধ্যে কেবল ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানাটি পূর্ণোদ্যমে চালু রয়েছে, যার দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৮০০ টন। গত ৪ মার্চ থেকে যমুনা, আশুগঞ্জ ও তারাকান্দির মতো বড় কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে সাময়িক ভাটা পড়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে একসময় চাহিদার ৮০ শতাংশ সার উৎপাদিত হতো। বর্তমানে প্রাকৃতিক গ্যাসের স্বল্পতার কারণে সেই ধারাবাহিকতায় কিছুটা ছেদ পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, আমদানি ব্যয় কমাতে প্রয়োজনে এলএনজি আমদানি করে হলেও দেশীয় কারখানাগুলো সচল রাখা হলে দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয় হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা শুরুতেই কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিলেও বিসিআইসি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রথম ও দ্বিতীয় দফার দরপত্রে আংশিক সাড়া পাওয়া গেলেও, এখন তৃতীয় দফার প্রস্তুতি চলছে।
শুধুমাত্র সৌদি আরব বা কাতার নয়, বাংলাদেশ এখন সার আমদানির জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হাত বাড়িয়েছে:
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইয়ের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। রাশিয়া ও বাহরাইনের মতো বৃহৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর সাথেও প্রাথমিক আলোচনা চলছে।
একনজরে গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান
বিসিআইসি সুত্র জানিয়েছে, আমন মৌসুমের চাহিদা ৬ লাখ ৬৫ হাজার টন । চলতি অর্থবছরে আমদানি ১৩ লাখ ১৪ হাজার টন (এ পর্যন্ত) । নিরাপদ মজুদ লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ টন, বর্তমান মজুদ ৩ লাখ ৪৩ হাজার টন । ফলে নিরাপদ মজুতের ক্ষেত্রে ঘাটতি প্রায় এক লাখ টন। বিভিন্ন সার কারখানা বন্ধ হয়ে যাবার পর এখন দেশে চালু কারখানা ১টি (ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা) |
কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বিসিআইসির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আশাবাদী যে, জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) চুক্তির আওতায় সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে দ্রুত ৩ লাখ টন সার দেশে পৌঁছাবে। এতে আমন মৌসুমে কৃষকের সারের কোনো সংকট হবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর নির্ভর না করে আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। একই সাথে দেশীয় কারখানাগুলো সচল করতে গ্যাসের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ পুনরায় সারের উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারবে।
প্রতিকূলতা থাকলেও সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ত্বরিত পদক্ষেপ কৃষকের দোরগোড়ায় সার পৌঁছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বৈশ্বিক এই সরবরাহ সংকট সাময়িক; সঠিক পরিকল্পনা এবং বিকল্প বাজার ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার সোনালি ফসলের ধারা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

