সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা: সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 15 Mar, 2026
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। রোববার (১৫ মার্চ) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৭৪ পৃষ্ঠার এ রায় প্রকাশ করা হয়। রায়টি লিখেছেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
এর আগে গত ২০ নভেম্বর ওই রায় দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ আদালত। বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৭ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বিভাগ ঐতিহাসিক এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর ৬ বিচারপতি ছিলেন— বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম ইমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
রায়ে বলা হয়, সর্বসম্মতিতে আপিলগুলো মঞ্জুর করা হলো, সে আলোকে রিভিউ আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করা হলো। নথিদৃষ্টে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে আপিল বিভাগের রায়টি (২০১১ সালের রায়) একাধিক ক্রটিপূর্ণ। অতএব পর্যালোচনাধীন রায়টি (২০১১ সালের রায়) সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হলো।
১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধন আইনের ধারা ৩ দিয়ে সন্নিবেশিত হওয়া সংবিধানের চতুর্থ ভাগের পরিচ্ছেদ ‘২ক পরিচ্ছেদ-নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ সম্পর্কিত বিধানাবলি এ রায়ের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত ও সক্রিয় করা হলো বলে আপিল বিভাগ উল্লেখ করেন।
রায়ে আরো বলা হয়, এরূপ পুনরুজ্জীবন ‘পরিচ্ছেদ ২ক’–এ উল্লেখিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত বিধানাবলির স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহাল নিশ্চিত করে। তবে পুনরুজ্জীবিত অনুচ্ছেদ ৫৮খ(১) এবং অনুচ্ছেদ ৫৮গ(২)–এর বিধানের প্রয়োগ সাপেক্ষে তা কার্যকর হবে। পুনর্বহাল ও পুনরুজ্জীবিত ‘পরিচ্ছেদ ২ক’–এ উল্লেখিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত বিধানাবলি কেবল ভবিষ্যৎ প্রয়োগযোগ্যতার ভিত্তিতে কার্যকর হবে।
প্রসঙ্গত, গত ২১ অক্টোবর নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে আপিলের শুনানি শুরু হয়। পরে গত ২২ অক্টোবর নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে আপিলের দ্বিতীয় দিনের শুনানি শেষ হয়। এ দু’দিন রিটকারী বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে শুনানি শেষ করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। এরপর গত ২৩ অক্টোবর তৃতীয় দিনের মতো মামলাটির শুনানি হয়।
গত ২৮ অক্টোবর নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে আপিলের চতুর্থদিনের শুনানি করেন জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি শেষ করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। এরপর গত ২৯ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে আপিলের ৫ম দিন, গত ৩ ও ৪ নভেম্বর ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম দিনের মতো শুনানি করেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন ও ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। নবম দিন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
শুনানিকালে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে দিয়ে সাময়িক সমাধান দিতে চায় না আপিল বিভাগ। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে কার্যকর সমাধান চায় আপিল বিভাগ। যাতে এটি বারবার বিঘ্নিত না হয়। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে এটি যাতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখে, সেটিই করা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে দিলে তা কখন থেকে কার্যকর হবে— সে প্রশ্নও রেখেছিলেন প্রধান বিচারপতি।
জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছিলেন, গেল দেড় দশকে দেশের মানুষ শাসিতের পরিবর্তে শোষিত হয়েছে নানাভাবে। মানুষ গুম খুন বিচার বহির্ভূত হত্যা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এগুলো থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যেসব সিস্টেম ছিল সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে এবং মানুষ বিচার পায়নি। যার কারণে এই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতন হয়েছে। আর সেই রাজপথ থেকেই নির্ধারিত হয়েছে কে প্রধান বিচারপতি হবেন আর কে সরকার প্রধান হবেন। জনগণের এই ক্ষমতাকে কোনোভাবেই অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। এসব অবজ্ঞা করলেই বিপ্লবের সৃষ্টি হয়। এসময় তিনি ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন।
পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন আপিল বিভাগ। পাশাপাশি পুনরায় এ বিষয়ে আপিল শুনানির জন্য ২১ অক্টোবর দিন নির্ধারণ করা হয়। প্রায় ১০ দিনের মামলার সব পক্ষের আবেদনের শুনানি শেষে গত ১১ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৭ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ রায়ের জন্য গত ২০ নভেম্বর ত্রয়োদশ সংশোধনী আইনকে সংবিধান পরিপন্থী ও বাতিল ঘোষণা করে ১৪ বছর আগে আপিল বিভাগ রায় দিয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিতে এ রায় দেন।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

