ভারতে ৪ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রবিন খুদা
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 07 Jun, 2026
এআই ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের বিশ্ববাজার ধরতে ভারতের ডিজিটাল অবকাঠামোয় ৩ হাজার বিলিয়ন রুপি বা ৩০ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা) বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক ডেটা সেন্টার জায়ান্ট ‘এয়ারট্রাঙ্ক’ (AirTrunk)।
এই বিশাল অঙ্কের মেগা প্রকল্পটির পেছনের মূল রূপকার হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান বিলিয়নিয়ার উদ্যোক্তা রবিন খুদা।
২০৩০ সালের মধ্যে এই বিনিয়োগ সম্পন্ন করার মাধ্যমে ভারতকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের প্রধান হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে রবিন খুদার একটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিকভাবে এই বড় বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী রবিন খুদার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, "ভারতের ডিজিটাল অবকাঠামোগত যাত্রা এক অভূতপূর্ব গতি লাভ করেছে। এয়ারট্রাঙ্কের এই বিনিয়োগ ভারতের ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে প্রস্তাবিত অন্যতম বৃহত্তম বিনিয়োগ। এটি ক্লাউড কম্পিউটিং ও এআই-এর বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।"
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক সাময়িকী ফোর্বস (Forbes), ব্লুমবার্গ (Bloomberg) এবং লাইভমিন্ট (Livemint)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এয়ারট্রাঙ্ক হলো হাইপারস্কেল (Hyperscale) ডেটা সেন্টার খাতের একটি বৈশ্বিক পরাশক্তি।
২০১৫ সালে রবিন খুদা অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে এয়ারট্রাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১০-১১ সালের দিকে যখন বিশ্বজুড়ে ক্লাউড সার্ভিসের চাহিদা বাড়ছিল, তখনই রবিন বুঝতে পেরেছিলেন যে বড় বড় প্রযুক্তি জায়ান্টদের (যেমন- গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন) ডেটা সংরক্ষণের জন্য বিশাল এবং সাশ্রয়ী ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন হবে। সেই চিন্তা থেকেই জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার তৈরির উদ্দেশ্যে এয়ারট্রাঙ্কের যাত্রা শুরু হয়।
শুরুতে কোম্পানিটি বড় ধরনের তহবিল সংকটে পড়েছিল। রবিন খুদা তার জীবনের প্রায় সমস্ত ব্যক্তিগত সঞ্চয় এই কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালান। ২০১৭ সালের শুরুতে প্রয়োজনীয় ফান্ডিং নিশ্চিত করার পর অস্ট্রেলিয়ায় দেশের প্রথম এবং বৃহত্তম হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার স্থাপন করে বাজিমাত করে এয়ারট্রাঙ্ক।
বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে এয়ারট্রাঙ্কের অবিশ্বাস্য উত্থান দেখে ২০২৪ সালের শেষের দিকে বিশ্বের বৃহত্তম বিকল্প সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন (Blackstone) এবং কানাডা পেনশন প্ল্যান ইনভেস্টমেন্ট বোর্ড (CPPIB)-এর নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়াম কোম্পানিটিকে অধিগ্রহণ করে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তখন কোম্পানিটির মোট মূল্যায়ন বা ভ্যালুয়েশন ধরা হয়েছিল বিপুল পরিমাণ অর্থ। এই অধিগ্রহণের পরও রবিন খুদা কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এর একটি মূল্যবান অংশীদারিত্ব (শেয়ার) ধরে রেখেছেন।
এয়ারট্রাঙ্ক বর্তমানে এশিয়া-প্যাসিফিক ও মধ্যপ্রাচ্য (APME) অঞ্চলে তাদের ডেটা সেন্টার সাম্রাজ্য দ্রুত সম্প্রসারণ করছে।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, হংকং, জাপান, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে তাদের ১১টিরও বেশি বড় বড় ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস সচল রয়েছে এবং আরও প্রায় ৪০টি নতুন ডেটা সেন্টার তৈরির কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে 'লুমিনা ক্লাউডইনফ্রা' (Lumina CloudInfra) অধিগ্রহণের মাধ্যমে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের বাজারে প্রবেশ করে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএনআই (ANI এবং *ফরচুন ইন্ডিয়া (Fortune India)-র তথ্যমতে, ভারতে এয়ারট্রাঙ্ক মোট ৫ গিগাওয়াট (5 GW) ক্ষমতাসম্পন্ন ডেটা সেন্টার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে। এই বিনিয়োগের মূল বিষয়গুলো হলো: এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অংশটি বাস্তবায়িত হবে ভারতের বাণিজ্যিক রাজ্য মহারাষ্ট্রে। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনাবিস জানিয়েছেন, সেখানে এয়ারট্রাঙ্ক ৩ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিশালাকার 'ডেটা সেন্টার হাব' তৈরি করবে, যেখানে এককভাবে ২ লাখ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা হবে।
প্রাথমিক ধাপে লুমিনা অধিগ্রহণের মাধ্যমে পাওয়া মুম্বাই, চেন্নাই এবং হায়দরাবাদের ৬০০ মেগাওয়াটের প্রকল্পগুলোকে এই নতুন মেগা বিনিয়োগের সাথে যুক্ত করে আরও বড় পরিসরে রূপ দেওয়া হবে।
এয়ারট্রাঙ্ক মূলত নবায়নযোগ্য শক্তি (Renewable Energy) এবং টেকসই পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে এই ডেটা সেন্টারগুলো পরিচালনা করবে। রবিন খুদা ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের সাথে বৈঠকে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ও দ্রুত সরকারি অনুমোদনের ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন।
রবিন খুদা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, "এআই-এর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এখন শুধু প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখন অবকাঠামোর লড়াই। ভারত সরকারের 'ইন্ডিয়া এআই মিশন' (IndiaAI Mission) এবং সেমিকন্ডাক্টর নীতি বিশ্বমানের বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করেছে। ভারতের বিশাল দক্ষ তরুণ জনগোষ্ঠী ও নবায়নযোগ্য শক্তির সহজলভ্যতা আমাদের এই বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে দ্বিগুণ শক্তিশালী করেছে।"
ঢাকা থেকে অস্ট্রেলিয়ার বিলিওনিয়ার: রবিন খুদার অবিশ্বাস্য গল্প
রবিন খুদার এই সাফল্যগাথা বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। তার বাবা এস এম ওয়াজেদ আলী। রবিন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শের-ই-বাংলা নগর সরকারি বয়েজ হাই স্কুলএবং হারম্যান মেইনার কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে পড়াশোনা শেষ করেন।
১৯৯৭ সালে এইচএসসি পাস করার পর মাত্র ১৮ বছর বয়সে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান।
সেখানে 'ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনি' (UTS) থেকে অ্যাকাউন্টিং বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন।
পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন পার্ট-টাইম চাকরি করতেন। পরবর্তীতে সিপএ (CPA) যোগ্যতা অর্জন করে তিনি প্রযুক্তি খাতের করপোরেট দুনিয়ায় প্রবেশ করেন।
২০০৭ সালে ফুজিৎসু (Fujitsu) কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার এবং পরবর্তীতে NEXTDC নামক একটি ডেটা সেন্টার কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করে এই খাতে গভীর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন রবিন।
বর্তমানে রবিন খুদা অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ধনী ব্যক্তিদের একজন (১০৯তম ধনী)। ফোর্বস-এর রিয়েল-টাইম বিলিয়নিয়ার তালিকা অনুযায়ী, তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি 'খুদা ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন'-এর মাধ্যমে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক ও দাতব্য চিকিৎসাকাজে যুক্ত রয়েছেন।
বাঙালি মেধার এই বৈশ্বিক জয়জয়কার এবং ভারতের ডিজিটাল বিপ্লবে রবিন খুদার এয়ারট্রাঙ্কের এই ৪ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক মহলে বর্তমানে অন্যতম প্রধান শীর্ষ সংবাদ।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

