সংঘাত ও কূটনীতির দোলাচলে বিশ্ব: ট্রাম্প-পুতিন ফোনালাপ এবং উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 30 Apr, 2026
বিশ্ব রাজনীতির দুই প্রধান মেরু—ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে বুধবার এক দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ক্রেমলিনের তথ্যমতে, আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতি এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রাধান্য পেয়েছে। বিশেষ করে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ নিষ্পত্তিতে রাশিয়া সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুতিনকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, "আমাকে সহায়তা করার আগে আপনার নিজের (ইউক্রেন) যুদ্ধ শেষ করতে হবে।"এর পাশাপাশি পুতিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জয়ের বার্ষিকী উপলক্ষে ইউক্রেনে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবও দিয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের কৌশল অব্যাহত রেখেছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের বিশেষ অভিযানে এ পর্যন্ত ইরানের প্রায় ৫০ কোটি ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টো সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ না করা পর্যন্ত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে না। তাঁর মতে, "বোমাবর্ষণের চেয়ে অবরোধ বেশি কার্যকর।"
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নির্দেশ অমান্য করায় জব্দ করা হয়েছে ইরানি জাহাজ 'তউসকা'। যদিও এর ৬ জন ক্রুকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, তবে আরও ২২ জন এখনো মার্কিন হেফাজতে রয়েছেন।
এদিকে, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ অঞ্চলে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের একটি অত্যাধুনিক ‘হার্মিস ৪৫০জেড’ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লেবাননের বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে পানি শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামির স্পষ্ট করে বলেছেন, "লেবাননের সঙ্গে কোনো যুদ্ধবিরতি নেই,"এবং লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও অস্থিরতা স্পষ্ট। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা জন গারামেন্ডি এই যুদ্ধকে আমেরিকার জন্য একটি ‘চোরাবালি’ও ‘গুরুতর আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ডেমোক্র্যাটদের ‘সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ’ ও ‘পরাজয়বাদী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
মিত্র দেশ জার্মানির সঙ্গেও ট্রাম্পের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। জার্মান চ্যান্সেলর মেৎসের সমালোচনার প্রেক্ষিতে ট্রাম্প জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন, যা ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ফাটলকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারে। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১১৬.৮ ডলারে পৌঁছেছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের **ওপেক (OPEC) ত্যাগের সিদ্ধান্ত একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একে ‘চমৎকার’ উদ্যোগ হিসেবে স্বাগত জানিয়ে আশা প্রকাশ করেছেন যে, এর ফলে তেলের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত দাম কমে আসবে।
দীর্ঘ ২৯৫ দিন সমুদ্রে অবস্থানের পর রেকর্ড গড়ে দেশে ফিরছে বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমছে না; বর্তমানে ওই অঞ্চলে একসঙ্গে তিনটি মার্কিন রণতরি অবস্থান করছে, যা ২০০৩ সালের পর নজিরবিহীন। পেন্টাগনের
তথ্যমতে, এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার।
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র থেকে শুরু করে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী কক্ষ—সর্বত্রই এখন অনিশ্চয়তার মেঘ। একদিকে পুতিনের মধ্যস্থতার চেষ্টা,
অন্যদিকে ট্রাম্পের অনড় কঠোর অবস্থান বিশ্বকে এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে নাকি কোনো সমঝোতার পথ তৈরি করছে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা এবং তেলের আকাশচুম্বী দাম বিশ্ব অর্থনীতিকে এক বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

