:

জ্বালানি সংকটে টালমাটাল এশিয়া: মস্কো-তেহেরানমুখী আমেরিকার মিত্ররা

top-news

 মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন বারুদের গন্ধ, তখন এশিয়ার অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে আদর্শিক দেয়াল ভেঙে তেলের সন্ধানে নামছে দেশগুলো।

ইরান ও রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা একসময় যারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করত, আজ সেই দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন ও জাপানের মতো কট্টর মার্কিন মিত্ররা নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় ভ্লাদিমির পুতিন ও মাসুদ পেজেশকিয়ানের দরজায় কড়া নাড়ছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে দেখছেন ওয়াশিংটনের 'কৌশলগত পরাজয়' এবং বৈশ্বিক মঞ্চে আমেরিকার ক্রমশ 'বন্ধুহীন' হয়ে পড়ার সঙ্কেত হিসেবে।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার চাদরে থাকা দেশগুলো এখন ওয়াশিংটনের নীতির চেয়ে নিজেদের 'জাতীয় স্বার্থ'কে প্রাধান্য দিচ্ছে। 

দক্ষিণ কোরিয়া: প্রেসিডেন্ট লি জে মিউংয়ের প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, জোটের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও ন্যাপথা ও গ্যাসের জন্য রাশিয়া ও ইরানের বিকল্প নেই। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের বন্দর থেকে তেল আনা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও দ্রুত।

ফিলিপাইন: জ্বালানি সংকটে জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করা ম্যানিলা এখন রাশিয়ার তেলের জন্য ওয়াশিংটনের কাছে নিষেধাজ্ঞার ছাড় চাইছে। তাদের সাফ কথা—পররাষ্ট্রনীতি এখন আর কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

ভারত: ভারতের অবস্থান বরাবরের মতোই ভারসাম্যপূর্ণ। তবে নতুন করে ইরানি তেল আমদানি শুরু করা এবং চীনা মুদ্রা (ইউয়ান) ব্যবহার করে লেনদেন করার বিষয়টি ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর যাকে বিশ্বমঞ্চে একঘরে করার চেষ্টা করেছিল পশ্চিমারা, মধ্যপ্রাচ্য সংকট তাকেই এখন ত্রাতার ভূমিকায় নিয়ে এসেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় রাশিয়ার তেলই এখন এশিয়ার দেশগুলোর একমাত্র ভরসা। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর মস্কো সফর এবং পুতিনের প্রতি তার প্রকাশ্য প্রশংসা প্রমাণ করে যে, রাশিয়ার জ্বালানি কূটনীতি আবারও সফল হচ্ছে। এমনকি চড়া দাম দিয়ে হলেও দেশগুলো এখন রুশ তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছে।

 ট্রাম্পের নীতি ও আমেরিকার ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও থিংক-ট্যাংকগুলোর মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'অস্পষ্ট' এবং 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতি মিত্রদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। 

অনিশ্চয়তা: ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধের অস্পষ্ট বার্তা এবং মিত্রদের প্রতি দায়বদ্ধতার অভাব এশীয় নেতাদের বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করছে।

নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা হ্রাস: ওয়াশিংটন নিজেই জ্বালানি সংকট সামাল দিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে বাধ্য হচ্ছে, যা আদতে ইরান ও রাশিয়ার অর্থনীতিকেই শক্তিশালী করছে।

জাপানের দ্বিমুখী অবস্থান: জাপান তার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য মেনে ইরান ও আমেরিকা—উভয় পক্ষের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু টোকিও যখন সরাসরি তেহরানের সাথে তেলের বিষয়ে আলোচনা করে, তখন তা ওয়াশিংটনের একতরফা চাপের নীতির সীমাবদ্ধতাকেই ফুটিয়ে তোলে।

জ্বালানি যখন রাজনীতির প্রধান অস্ত্র
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এশিয়ায় আসা তেলের ৮০ শতাংশই এখন ঝুঁকির মুখে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে চীন ও রাশিয়া। ব্রিকস (BRICS) প্লাস জোটের দেশগুলো নিজস্ব মুদ্রায় তেল বাণিজ্যের যে ধারা শুরু করেছে, তা মার্কিন ডলারের আধিপত্যকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

আমেরিকা কি বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে?

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে উঠে আসছে এক রূঢ় সত্য—আমেরিকা তার মিত্রদের নিরাপত্তা দিতে পারলেও জ্বালানি সংকটের মতো অর্থনৈতিক দুর্যোগে পাশে দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। যখন একটি দেশ তার জনগণের ঘরে আলো জ্বালাতে বা শিল্পকারখানা সচল রাখতে হিমশিম খায়, তখন 'গণতন্ত্র বনাম একনায়কতন্ত্রের' লড়াইয়ের চেয়ে 'তেল ও গ্যাস' বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। 

এশিয়ার দেশগুলোর মস্কো ও তেহরান মুখী এই যাত্রা কেবল তেলের জন্য নয়, বরং এটি একটি পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত, যেখানে ওয়াশিংটনের একক খবরদারি আর খাটছে না। জ্বালানি সংকটের এই যুদ্ধে জয়ী হিসেবে যদি রাশিয়া ও ইরান আবির্ভূত হয়, তবে উত্তর-যুদ্ধ পৃথিবীতে আমেরিকা নিজেকে অনেক বেশি একা আবিষ্কার করতে পারে।

তথ্যসূত্র:** রয়টার্স, এএফপি, ব্লুমবার্গ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জ্বালানি পর্যবেক্ষণ সংস্থা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *