নুন-ভাতের পেটে টান: বেকারি পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে বিপন্ন শ্রমজীবীর জীবন
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 15 Sep, 2026
উনুনের আঁচে ঘাম ঝরিয়ে সারাদিন রিকশার প্যাডেল ঘোরান আলমগীর, কিংবা কাকডাকা ভোরে তৈরি পোশাক কারখানার দিকে ছোটেন আসমা বেগম। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে খেটে খাওয়া এই মানুষদের দিনে দু'বেলা পেট ভরে ভাত খাওয়া যেখানে এখন বড় ধরনের সংগ্রামের নাম, সেখানে কাজের ফাঁকে সামান্য ক্লান্তি মেটাতে এক কাপ চা আর একটি বনরুটিই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা।
কিন্তু সেই সস্তা ও সহজলভ্য নাশতার ওপরও এবার কোপ বসিয়েছে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। সম্প্রতি বেকারির তৈরি বনরুটি, পাউরুটি ও কেকের দাম পিসপ্রতি ৫ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষ।
প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় ৫ টাকা খুব বড় অঙ্ক মনে না হলেও, একজন রিকশাচালকের জন্য তা পাহাড়সম। দিনে তিন-চারবার চা-রুটি খেলে এখন তাঁদের অতিরিক্ত ২০ থেকে ৩০ টাকা গুনতে হচ্ছে, যা তাঁদের দিনে কষ্টের উপার্জনের বড় একটি অংশ কেড়ে নিচ্ছে।
সেগুনবাগিচার রিকশাচালক রফিকুল কিংবা পোশাকশ্রমিক আসমা বেগমের মতো হাজারো মানুষের ক্ষোভ ও দুশ্চিন্তার গল্প এখন একই—সন্তানের মুখে দুটো বিস্কুট তুলে দেওয়া কিংবা সারাদিনের খাটুনি শেষে একটু নাশতায় পেট ভরানোও যেন তাঁদের জন্য বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কাঁচামালের দরবৃদ্ধির অজুহাতে বেকারি পণ্যের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি—ময়দা, চিনি, ভোজ্যতেল, ডালডা এবং জ্বালানি গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বেকারি টিকিয়ে থাকতেই তারা এই মূল্য সমন্বয় করতে বাধ্য হয়েছেন।
টিসিবির তথ্যও বলছে, গত এক বছরে ও ছয় মাসের ব্যবধানে খোলা ময়দা, সয়াবিন তেল ও চিনির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দর ২০ শতাংশ বাড়ানোর কথা থাকলেও খুচরা বাজারে ১০ টাকার রুটি বা কেক বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকায়, যা কার্যত ৫০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি। আবার কোথাও কোথাও দাম একই রেখে পণ্যের ওজন ৪০ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৩৫ গ্রাম করা হয়েছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.০২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি পৌঁছায় ৯.৩২ শতাংশে। চাল, ডাল, মাছ, মাংস ও সবজির বাজারে আগেই যে আগুন লেগেছিল, তা সামাল দিতেই খেটে খাওয়া মানুষ হিমশিম খাচ্ছিলেন। তার ওপর সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও কৃষিজাত সামগ্রীর কর ও শুল্ক ছাড় দেওয়া সত্ত্বেও বাজারে তার কোনো সুফল মিলছে না। বোতলজাত সয়াবিন তেল থেকে শুরু করে চাল ও মসলার দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
উৎপাদন খরচ ও বাজারের বাস্তবতায় বেকারি মালিকদের যুক্তি হয়তো অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অমূলক নয়, কিন্তু বাজার তদারকির অভাব ও অরাজকতার খেসারত দিতে হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষদের।
যে দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে শ্রমজীবী মানুষের রক্তের ফোঁটায়, সেখানে তাঁদের নিত্যদিনের এক কাপ চা আর বনরুটির সামান্য তৃপ্তিটুকুও যদি ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়, তবে তা শুধু একখণ্ড রুটির দাম বৃদ্ধি থাকে না—তা হয়ে ওঠে হাজারো মেহনতি মানুষের বাঁচার আকুতির প্রতি এক করুণ চাবুক।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

