জ্বালানি সংকট ও শিল্প বিপর্যয়ে বাংলাদেশ: তীব্র হচ্ছে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যের ঝুঁকি
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 29 Aug, 2026
বিশ্ব অর্থনীতির টানাপোড়েন, মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত এবং অভ্যন্তরীণ তীব্র জ্বালানি সংকটের বহুমাত্রিক অভিঘাতে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত ও সরকারের সংকুচিত আর্থিক সক্ষমতার পটভূমিতে কর্মসংস্থান সংকোচন এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর প্রত্যক্ষ ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে চলতি বছরে দারিদ্র্যসীমা থেকে ১৭ লাখ মানুষের বেরিয়ে আসার পূর্বাভাস থাকলেও তা নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। এর ফলে অন্তত ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ হারাবেন।
শুধু ২০২৫ সালেই দেশে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ দরিদ্র মানুষ যুক্ত হয়েছে, যা চলমান সংকটে আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমদানিনির্ভরতা। দেশে মোট প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে, যার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কমে গেছে।
অন্যদিকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০–৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫–৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটিতে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষিত হওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণেরও বেশি মূল্যে (প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলার) গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের মোট ভর্তুকির দায় ২.৫ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৪.৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা মোট জিডিপির প্রায় ২.৮ শতাংশ।
জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতির সরাসরি আঘাত লেগেছে দেশের উৎপাদন খাতে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রতিবেদন অনুসারে, শিল্পে গ্যাস ব্যবহার ১,১৮৬ মিলিয়ন ঘনমিটার থেকে ১,১৪৮ মিলিয়নে নেমেছে এবং শিল্প বিদ্যুতের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক (-০.১%) পর্যায়ে ঠেকেছে।
ফলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, ব্যাংকগুলোতে এলসি খোলার জটিলতা, বৈশ্বিক বাজারে ক্রয়াদেশের পতন এবং শ্রমিক অসন্তোষের কারণে দেশের শিল্প কারখানাগুলো একের পর এক বন্ধ হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসেই গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে এবং চাকরি হারিয়েছেন ৬১,৮৮১ জন শ্রমিক।
গত দুই বছরে বন্ধ হওয়া কারখানার মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫৭টিতে। লিথী গ্রুপ, কেয়া গ্রুপ ও বেক্সিমকোর মতো বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বহু ইউনিট বন্ধ হওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক বকেয়া মজুরি না পেয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ম্যানুফ্যাকচারিং ও সামগ্রিক শিল্প খাতের উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধি শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
শিল্প খাতের পাশাপাশি সংকট বিস্তৃত হয়েছে কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবাতেও। দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিতেই গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় রাসায়নিক সারনির্ভর বাংলাদেশের কৃষকেরা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন, যা খাদ্যনিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
অন্যদিকে প্রায় ২৫০টি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির কাঁচামাল আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামো পরিচালনায় অতিরিক্ত জ্বালানি খরচের কারণে সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে গেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বহুমুখী চাপ শুধু বেকারত্বই বাড়াবে না, বরং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা পুরোপুরি নিঃশেষ করে আয়বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলবে।
জরুরি সংস্কার, বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি ছাড়া এই নজিরবিহীন স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

