:

চতুর্থ স্তম্ভের পতন: সংবাদকর্মীর শ্রম শোষণ ও চাটুকারিতার ব্যবচ্ছেদ

top-news

রাষ্ট্রের যে অঙ্গটিকে একসময় ‘ওয়াচডগ’ বা জনগণের পাহারাদার বলা হতো, তা আজ ক্ষমতার গৃহপালিত প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রের যে চারটি স্তম্ভের ওপর একটি দেশের টিকে থাকার কথা, তার চতুর্থ স্তম্ভ—গণমাধ্যম—আজ বিশ্বজুড়েই এক অভূতপূর্ব অস্তিত্ব সংকটের মুখে।

তবে উন্নত বিশ্বে যেখানে এই সংকট মূলত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও আয়ের উৎস হারানোর, সেখানে বাংলাদেশে এই সংকট নীতি-নৈতিকতার দেউলিয়াত্ব, ক্ষমতার নগ্ন চাটুকারিতা এবং সংবাদকর্মীদের চরম শ্রম শোষণের।

বিশ্ব গণমাধ্যমের মানচিত্রের দিকে তাকালে মূলত তিনটি স্পষ্ট মডেল চোখে পড়ে। প্রথমটি হলো স্ক্যান্ডিনেভিয়ান মডেল—নরওয়ে, ফিনল্যান্ড বা সুইডেন, যেখানে গণমাধ্যম রাষ্ট্র বা কর্পোরেট শেকল থেকে মুক্ত।

রিপোটার্স উইদাউট বর্ডারস (RSF)-এর ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বছরের পর বছর শীর্ষস্থানে থাকা এই দেশগুলোতে গণমাধ্যমের অর্থায়ন হয় পাবলিক ফান্ড বা স্বাধীন ট্রাস্টের মাধ্যমে, যার ফলে সাংবাদিককে সরকারের মুখাপেক্ষী হতে হয় না।

ইউকে-র বিবিসি কিংবা জার্মানির ডয়চে ভেলে বহু বছর ধরে এই পাবলিক সার্ভিস মডেলেই নিজেদের বস্তুনিষ্ঠতা ধরে রেখেছে।

দ্বিতীয়টি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো চরম রাজনৈতিকভাবে মেরুকৃত বাজার মডেল, যেখানে গণমাধ্যম কোনো না কোনো দলীয় মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে। আর তৃতীয়টি হলো চীন বা রাশিয়ার মতো কর্তৃত্ববাদী মডেল, যেখানে সংবাদমাধ্যম স্রেফ রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র।

একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যমের মূল কাজ হলো ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও আকাক্সক্ষাকে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা। কিন্তু বাংলাদেশে গণমাধ্যমের এই মূল চরিত্র চরমভাবে স্থানচ্যুত হয়েছে।

দেশে শত শত দৈনিক পত্রিকা, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং অনলাইন পোর্টাল থাকলেও এই বিশাল সংখ্যাটি স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকাশ নির্দেশ করে না। নোয়াম চমস্কি তাঁর বিশ্বখ্যাত 'ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট' তত্ত্বে সংবাদের যে 'পাসপোর্ট ফিল্টারিং'-এর কথা বলেছিলেন, বাংলাদেশে তা চরম নগ্ন রূপ নিয়েছে।

বাংলাদেশে অধিকাংশ বড় মিডিয়া হাউজের মালিক দেশের শীর্ষ স্থানীয় কর্পোরেট গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা।

তাদের কাছে পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল চালানো কোনো লাভজনক ব্যবসা নয়, বরং নিজেদের প্রধান ব্যবসা রক্ষা, কোটি কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নিশ্চিত করা, কিংবা আইনি ঝামেলা থেকে রেহাই পাওয়ার একটি ‘প্রটেকশন শিল্ড’ বা সামাজিক বর্ম।

ফলস্বরূপ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জায়গায় জায়গা করে নিয়েছে ক্ষমতার তোষামোদ। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্য, ব্যাংকিং খাতের হরিলুট বা ভোটাধিকার হরণের মতো জাতীয় সংকটের দিনে যখন জনগণ চিৎকার করেছে, মূলধারার গণমাধ্যম তখন ক্ষমতার সুবিধাজনক বয়ান তৈরিতে ব্যস্ত থেকেছে। আর এই জনবিচ্ছিন্নতার কারণেই সাধারণ মানুষ আজ বিকল্প মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর ভরসা করতে বাধ্য হচ্ছে।

তবে এই নৈতিক বিপর্যয়ের নেপথ্যে রয়েছে সংবাদকর্মীদের নিঃশব্দে ধুঁকে ধুঁকে মরা আরেক করুণ সত্য—চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক দাসত্ব।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতাকে পেশা বলা হলেও সাংবাদিকদের বড় অংশটি মারাত্মক শ্রম শোষণের শিকার। বাংলাদেশ শ্রম আইন ও ওয়েজ বোর্ড আইনকে তোয়াক্কা না করে যখন-তখন কোনো কারণ দর্শানো ছাড়া বা পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সাংবাদিকদের ছাঁটাই করা নিত্যদিনের ঘটনা। বছরের পর বছর কাজ করার পরও নিয়মিত নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না, মাসের পর মাস বেতন বকেয়া রাখা হয় এবং উৎসব বোনাস থেকে বঞ্চিত করা হয়।

মফস্বল বা আঞ্চলিক সাংবাদিকদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। তাদের নিয়মিত বেতন তো দূরের কথা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সুবিধাই দেওয়া হয় না; উল্টো পত্রিকার আইডি কার্ড টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে তাদের বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতে বাধ্য করা হয়।

একজন সাংবাদিককে যখন বেঁচে থাকার নূন্যতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেওয়া হয় না, তখন তাকে পরোক্ষভাবে অসৎ পথ বা ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়। অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু ও চাকরি হারানোর আতঙ্কে থাকা সাংবাদিক দিয়ে কখনো স্বাধীন বা সৎ সাংবাদিকতা সম্ভব নয়।

এই অন্ধকার গলিপথ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক সৎ মডেলগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

প্রথমত, মিডিয়ার মালিকানা এবং সম্পাদকীয় নীতিকে আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সম্পূর্ণ পৃথক করতে হবে, যাতে মালিক কেবল বাণিজ্যিক পরিচালনা দেখবেন, কিন্তু সংবাদে হাত দিতে না পারবেন না।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক আনুকূল্যের লাইসেন্সিং ব্যবস্থা বন্ধ করে একটি স্বাধীন জাতীয় সম্প্রচার কমিশন গঠন করতে হবে।

তৃতীয়ত, শ্রম আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে নোটিশ ছাড়া বেআইনি ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে এবং বকেয়া বেতন না দেওয়া প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিত করার মতো কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

রাষ্ট্র ও কর্পোরেট প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন ‘পাবলিক মিডিয়া ফান্ড’ গঠন করা প্রয়োজন, যা থেকে বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি অনুদান দেওয়া যাবে।

ক্ষমতার তোষামোদকারী এবং নিজের কর্মীদের পেটে লাথি মারা গণমাধ্যম কোনোদিন সমাজের দর্পণ হতে পারে না।

অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষিত, নীতিবান ও মুক্ত সাংবাদিকতাই পারে একটি ভঙ্গুর সমাজকে রক্ষা করতে—অন্যথায় ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ ধ্বংস হয়ে পুরো রাষ্ট্রের ওপরই ধসে পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *