জিডিপি-বিনিয়োগে বড় পতন: জ্বালানি সংকট ও অনিশ্চয়তায় স্তব্ধ শিল্পায়ন
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 05 Aug, 2026
সংকটের আবহে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে দেশের উৎপাদন ও বিনিয়োগ খাতে। যে কলকারখানার সাইরেন আর যন্ত্রের গর্জন একসময় অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন তৈরি করত, সেখানে এখন কেবলই শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার প্রতিধ্বনি।
সাম্প্রতিক সময়ের তথ্য-উপাত্ত ও অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের পর্যালোচনায় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্রে এক মারাত্মক স্থবিরতার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসের সর্বনিম্নে। করোনা মহামারীর চূড়ান্ত ধাক্কার সময়ে কিংবা এর পরবর্তী যেকোনো অর্থবছরের চেয়েও এই হার কম, এমনকি ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক। এ যেন কোনো নিছক পরিসংখ্যানে পতন নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার এক ভীতিকর সংকেত।
বিনিয়োগের এই মারাত্মক খরা প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলছে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি)।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে জিডিপি-বিনিয়োগ অনুপাত ছিল ৩০ দশমিক ৯৫ শতাংশ, তিন বছরের ধারাবাহিক পতনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে এসে ঠেকেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে বেসরকারি খাতে, যেখানে অনুপাত ২৪ দশমিক ১৮ শতাংশ থেকে একলাফে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে নেমে গেছে।
উদীয়মান অর্থনীতির দেশে টেকসই কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের জন্য যেখানে এই অনুপাত ৫০ শতাংশের কাছাকাছি থাকা বাঞ্ছনীয়, সেখানে এই ঋণাত্বক ধারা অর্থনীতিকে ঠেলে দিচ্ছে এক গভীর অচলাবস্থায়। এই অর্থনৈতিক অচলাবস্থার পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে জ্বালানি সংকট, বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়।
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশে দৈনিক প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ২,৬৭০ মিলিয়ন ঘনফুট, অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি ১,১৩০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি। কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটি ও সাম্প্রতিক নানা কারিগরি সংকটে এই ঘাটতি আরো ঘনীভূত হয়েছে। ফলে সাভার, গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ কিংবা চট্টগ্রাম—সর্বত্রই কলকারখানার উৎপাদন ক্ষমতা ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, আর নতুন কারখানা তো চালুই করা যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক তথ্য বিশ্লেষণ ও বৈশ্বিক গণমাধ্যমের পর্যবেক্ষণেও এই উদ্বেগের সত্যতা মিলছে। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং রয়টার্স ও ব্লুমবার্গের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার একাধিক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে যে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং ব্যাংকিং খাতের বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করে দিয়েছে।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি ক্রয়ে ডলার সংকটের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখন চরম 'ধীরচলো' নীতি গ্রহণ করেছেন।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে তৈরি পোশাকসহ প্রধান প্রধান রপ্তানি খাতে নতুন ক্রয়াদেশ প্রত্যাশার চেয়ে ধীরগতির। একই সাথে, দেশে নতুন কারখানা তৈরি না হওয়া এবং বিদ্যমান অনেক কারখানা আংশিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান ও বেকারত্বে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) অনুমিত হিসাব ও স্থানীয় অর্থনীতিবিদদের মতামত অনুযায়ী, প্রতি বছর বাজারে আসা লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর বড় অংশই এখন কর্মসংস্থানহীনতার শিকার, যা সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একদিকে শিল্প খাত যখন উৎপাদন সংকটে, অন্যদিকে কৃষি খাত ও গ্রামীণ অর্থনীতিও খুব একটা সুসংবাদ দিতে পারছে না।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, রাসায়নিক সারের বাড়তি খরচ এবং পরিবহন ব্যয়ের কারণে কৃষি উৎপাদনে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, অথচ প্রান্তিক কৃষক সেই তুলনায় না পাচ্ছেন পণ্যের ন্যায্যমূল্য, না পাচ্ছেন সহজ শর্তে পর্যাপ্ত ঋণ।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯.৫ শতাংশে এনেছে এবং বেসরকারি খাতকে চাঙা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তবুও শিল্প উদ্যোক্তা ও শীর্ষ ব্যাংকাররা স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছেন—শুধু সস্তা ঋণ দিয়ে বন্ধ কারখানা চালু করা যাবে না, যদি না নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সুনিশ্চিত হয়।
সব মিলিয়ে, ঋণের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি আর বিনিয়োগের এই ঐতিহাসিক পতন কেবল কয়েকটি সংখ্যার খেলা নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ার এক আগাম সতর্কবার্তা।
দ্রুততম সময়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতের আস্থার সংকট দূর করা এবং বাস্তবভিত্তিক নীতি সহায়তা না দিলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির চাকা যেমন থমকে যাবে, তেমনই কর্মসংস্থানের অভাবে পুরো অর্থনীতি এক অনিশ্চিত অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *
Edris Ali
খুবই দুর্ভাগ্যজনক বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য। আমরা যদি সস্তা জনপ্রিয়তা কিংবা চেতনা বাণিজ্যকে মৌলবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে নাড়াচাড়া করি, অস্থিরতাকে বাড়িয়ে দেয়া কর্মতৎপরতাকে ও দূরদর্শিতা দিয়ে প্রভাবিত করি, পররাষ্ট্রনীতিকে দেশের প্রয়োজনের চেয়ে রাজনৈতিক টিকে থাকার হাতিয়ার বানাই, তাহলে আমাদের আরো কঠিন পরিণতির দিকে দ্রুত ধাবিত হতে হবে। এটা কোনভাবেই কাম্য নয়।

