তিস্তা প্রকল্পে সব ধরনের সহায়তা অব্যহত রাখবে চীন: চীনা রাষ্ট্রদূত
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 02 Jul, 2026
তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে কারিগরিসহ সব ধরনের সহায়তা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার চীন দূতাবাসে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে এ নিয়ে কথা বলেন তিনি।
ইয়াও ওয়েন বলেন, গত ২২ থেকে ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর দুদেশের সম্পর্কে গতি সঞ্চার করেছে এবং বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার পরবর্তী ধাপের জন্য একটি সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেছে। এ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো, চীন-বাংলাদেশ ‘কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’কে আরো এগিয়ে নেয়া, যাতে নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের এক চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি গড়ে তোলা যায়। এ সম্পর্ককে তিনি এশিয়ার বন্ধুভাবাপন্ন প্রতিবেশীদের সঙ্গে চীনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্পর্ক হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি জানান, উভয় দেশ উচ্চ-পর্যায়ের সফর বিনিময় বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়া উভয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে একটি কৌশলগত সংলাপ ব্যবস্থা (স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগ মেকানিজম) প্রতিষ্ঠা এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক একটি ‘২+২’ সংলাপ ব্যবস্থার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার বিষয়েও একমত হয়েছে দুই দেশ।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, চীন সবসময়ই বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের উন্নয়নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ভালো প্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ নীতিতে অবিচল থেকেছে। বিশ্ব পরিস্থিতি যতই পরিবর্তিত হোক না কেন, চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সামগ্রিক দিকনির্দেশনার প্রতি চীনের প্রতিশ্রুতি কখনোই নড়চড় হবে না। চীন সবসময়ই বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী এবং ভালো অংশীদার হয়ে থাকবে।
ইয়াও-এর মতে, চীনই প্রথম দেশ যারা কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় দলিলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সমর্থন করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশও ‘এক চীন নীতি’র প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং তাইওয়ানের যেকোনো ধরনের স্বাধীনতার বিরোধিতার বিষয়টি পুনরুল্লেখ করেছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় উচ্চ-মানের সহযোগিতা এগিয়ে নিতে, নিজ নিজ উন্নয়ন কৌশলগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে এবং গ্রিন ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্য প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বাণিজ্য, অর্থায়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে।
তিনি আরো জানান, বিনিয়োগ সহযোগিতা আরো সহজতর করতে বাংলাদেশ চীনে তার প্রথম বিদেশী বিনিয়োগ কার্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। সফরকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৭টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন চুক্তি, সমঝোতা স্মারক, একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা এবং একটি কৃষি বাণিজ্য প্রটোকল। এগুলো উন্নয়ন, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, বন্দর, শিল্পাঞ্চল, গণমাধ্যম, শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, সবুজ উন্নয়ন এবং রপ্তানি বৃদ্ধির মতো ক্ষেত্রগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতায় জোর দেয়া হয়েছে।
স্বাক্ষরিত স্মারকের মধ্যে রয়েছে গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই) বাস্তবায়নে সহযোগিতা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে বিনিময় ও সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক এবং বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা চুক্তি।
অন্যান্য নথির মধ্যে রয়েছে মোংলা বন্দর সুবিধার সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ প্রকল্প সংক্রান্ত চুক্তি, ২০২৬ মানবসম্পদ উন্নয়ন সহযোগিতা কর্মসূচি যৌথভাবে বাস্তবায়নের সমঝোতা স্মারক এবং বাংলাদেশ থেকে চীনে কাঁচা কাঁঠাল রফতানির ফাইটোস্যানিটারি (উদ্ভিদ স্বাস্থ্য বিষয়ক) প্রয়োজনীয়তা সংক্রান্ত একটি কৃষি বাণিজ্য প্রোটোকল।
এছাড়া উভয় পক্ষ মিডিয়া সহযোগিতায় বেশ কয়েকটি চুক্তি সই করেছে। এর মধ্যে চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি), বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার পৃথক সমঝোতা স্মারক রয়েছে।
স্বাক্ষরিত অন্যান্য দলিলের মধ্যে রয়েছে চীনা ভাষা শিক্ষায় সহযোগিতা সংক্রান্ত চুক্তি, কারিগরি শিক্ষায় সহযোগিতা জোরদার করার সমঝোতা স্মারক, পরিবেশবান্ধব বা সবুজ উন্নয়নে বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধি বিষয়ক সমঝোতা স্মারক এবং বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে একটি যৌথ রফতানি প্রচার কর্মপরিকল্পনা।
পাশাপাশি চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক শিল্প অঞ্চলের (সিইআইজেড) জন্য একটি শিল্প উন্নয়ন ও ভূমি ইজারা চুক্তি, চীন-বাংলাদেশ মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নে সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক এবং চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডের (সিসিপিআইটি) সঙ্গে একটি বিনিয়োগ সহযোগিতা চুক্তি সই হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে চীনে কাঁচা কাঁঠাল রফতানির জন্য ‘ফাইটোস্যানিটারি রিকোয়ারমেন্টস’ সংক্রান্ত প্রটোকল স্বাক্ষরের বিষয়টিকেও স্বাগত জানান ইয়াও ওয়েন। তিনি বলেন, আম সফলভাবে রপ্তানির পর এবার বাংলাদেশের কাঁঠালও চীনের বাজারে প্রবেশ করবে।
তিস্তা নদী সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প (টিআরসিএমআরপি) প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত এই উদ্যোগে চীনের ধারাবাহিক সমর্থনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, একটি বিষয়ে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, তিস্তা নদী প্রকল্পের বিষয়ে চীনের প্রতিশ্রুতি অপরিবর্তিত রয়েছে। তিস্তা নদী সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের জন্য চীন তার সক্ষমতার মধ্যে সমর্থন ও সহায়তা দেয়া অব্যাহত রাখবে এবং এর সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) ও সংশ্লিষ্ট কাজ ত্বরান্বিত করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা করবে।
তিনি বলেন, তিস্তা বাংলাদেশের একটি প্রকল্প। এটি আপনাদের প্রকল্প। রাষ্ট্রদূত প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’-কে একটি নতুন কৌশলগত সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে ইয়াও ওয়েন বলেন, অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণের ধারণাটি নতুন নয়। প্রায় ১৫ বছর আগে ‘বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার’ অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলোচনা হলেও তাতে কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার স্বার্থে চীন ‘বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর’ নির্মাণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, এ উদ্যোগে ভারতসহ অন্যান্য দেশের যোগদানের বিষয়ে চীনের দরজা উন্মুক্ত রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকেই তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিস্তা প্রকল্প প্রসঙ্গে ইয়াও ওয়েন বলেন, এ সফরের সময় ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ (টিআরসিএমআরপি)-এর ওপর বিশেষভাবে জোর দেয়া হয়েছে। কারণ এর সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে ইয়াও বলেন, বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতা অত্যন্ত ব্যাপক এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেরই একটি অংশ। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে চাননি।
রাষ্ট্রদূত বলেন, উভয় দেশ জাতিসংঘ-কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বজায় রাখতে, আরো ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা সমর্থন করতে এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে।
তিনি আরো জানান, জাতিসংঘ, ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় (এসসিও) বাংলাদেশের আরো বড় ভূমিকা পালনকে চীন সমর্থন করে।
বক্তব্যের সমাপ্তি টেনে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে ইয়াও ওয়েন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফর চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের পরিচালক ঝাং জিং এবং কাউন্সেলর সং ইয়াং উপস্থিত ছিলেন।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

