:

লোডশেডিং ও ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের আঘাত: সংকটের মুখে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত

top-news

দ্য ইকোনমিস্ট:

বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হলেও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের জাঁতাকলে পড়ে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি)। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেশের এই বৃহত্তম শিল্পের নাজুক পরিস্থিতি উঠে এসেছে। ঘন ঘন লোডশেডিং, কাঁচামালের আকাশচুম্বী মূল্য এবং উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি এ খাতকে এক গভীর মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ (প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি) আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু বর্তমানে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ চরমভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় কারখানাগুলো স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা হারাচ্ছে। দৈনিক ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে বিদেশি ক্রেতাদের বেঁধে দেওয়া নির্দিষ্ট সময়ে (ডিল ডেট) পণ্য সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিদ্যুৎ সংকটের বিকল্প হিসেবে পোশাক কারখানাগুলোকে এখন চড়া মূল্যের ডিজেলচালিত ব্যাক-আপ জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংকটের কারণে এবং সময়মতো উৎপাদন সচল রাখতে খোলা বাজার বা বিকল্প উৎস থেকে চড়া মূল্যে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে তৈরি পোশাকের উৎপাদন ব্যয় স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোকেমিক্যাল-ভিত্তিক কাঁচামাল যেমন সিন্থেটিক সুতা ও পলিয়েস্টারের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি।

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। অনেক নামী বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এখন বাংলাদেশ থেকে তাদের ক্রয়াদেশ (অর্ডার) সরিয়ে ভিয়েতনাম, ভারত কিংবা কম্বোডিয়ার মত বিকল্প দেশগুলোতে নেওয়ার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের বিপদের সংকেত।

তৈরি পোশাক খাতের এই অস্থিরতা ও মন্দার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর। ইতিমধ্যে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের বেশ কিছু কারখানা ব্যয়ভার বহনে ব্যর্থ হয়ে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন হাজার হাজার পোশাক শ্রমিক, যা সামগ্রিক কর্মসংস্থান ও নিম্ন-আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সংকটের মূল কারণসমূহ (এক নজরে):
জ্বালানি পরনির্ভরশীলতা: আমদানিকৃত এলএনজি ও কয়লার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।
অনিয়মিত বিদ্যুৎ: দৈনিক দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ে ব্যাহত উৎপাদন ব্যবস্থা।
বিকল্প জ্বালানির উচ্চ ব্যয়: জেনারেটর সচল রাখতে ডিজেলের অতিরিক্ত ব্যবহার ও কালোবাজারি।
কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি: সিন্থেটিক ও পেট্রোকেমিক্যাল উপাদানের চড়া দাম।
আস্থার সংকট: রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ক্রেতাদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা।

উত্তরণের প্রস্তাবিত উপায়:
১. জরুরি ভিত্তিতে পোশাক শিল্পাঞ্চলগুলোতে রেশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে হলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
২. বিকল্প জ্বালানি ও জেনারেটরের পার্টস আমদানিতে সাময়িক শুল্ক ছাড় ও ভর্তুকি প্রদান করা।
৩. আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক রিকভারি ব্র্যান্ডিং তৎপরতা জোরদার করা।
৪. ক্ষুদ্র ও মাঝারি (SME) পোশাক শিল্প রক্ষা করতে বিশেষ প্রণোদনা ও ঋণসহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করা।

 পোশাক শিল্প শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হাতিয়ারই নয়, এটি দেশের কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। এই বহুমুখী সংকট বা "পারফেক্ট স্টর্ম" থেকে অর্থনীতিকে বাঁচাতে অবিলম্বে সুদূরপ্রসারী জ্বালানি নীতি ও বিদ্যুৎ খাতের টেকসই সংস্কার অপরিহার্য।

-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *