পলাশী থেকে বঙ্গোপসাগর: আবারও কি মীরজাফরের প্রেতাত্মাদের কবলে বাংলাদেশ!!!
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 16 May, 2026
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে অস্তমিত হয়েছিল বাংলার স্বাধীনতা। ইতিহাস সাক্ষী, সেই পরাজয় শুধু ব্রিটিশদের সামরিক শক্তির জোরে আসেনি; তার পেছনে ছিল ভেতরের চরম প্রাসাদ ষড়যন্ত্র।
নবাবকে সাধারণ মানুষের কাছে ‘অযোগ্য’ ও ‘দোষী’ প্রমাণ করতে তৎকালীন কুশিলবরা ছড়িয়েছিল নানামুখী অপপ্রচার। আর পর্দার আড়ালে লর্ড ক্লাইভের সাথে হাত মিলিয়েছিল নবাবের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত মীরজাফররা।
কিন্তু ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। ক্ষমতার লোভে যারা সেদিন বিদেশী শক্তির হাতে দেশের স্বাধীনতা তুলে দিয়েছিল, মীরজাফর থেকে শুরু করে ঘষেটি বেগম বা রায়দুর্লভ—তাদের প্রত্যেকেরই শেষ পরিণতি হয়েছিল অত্যন্ত করুণ ও অবমাননাকর।
তবে সেই বিশ্বাসঘাতকতার খেসারত দিতে হয়েছে পুরো প্রজন্মকে। বাংলায় নেমে এসেছিল ব্রিটিশদের ২০০ বছরের নির্মম শাসন, শোষণ, নির্যাতন আর নীলকরদের অত্যাচার। অবশেষে তিতুমীর, সূর্যসেন থেকে শুরু করে আপামর জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মুখে তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হয় ইংরেজরা।
ব্রিটিশদের বিদায়ের পর সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসন-শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালিকে আবারও রুখে দাঁড়াতে হয়েছিল।
১৯৭১ সালে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বিশ্বমানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। আজ স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়ে বাংলাদেশ যখন বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই আবার এই ভূখণ্ডের ওপর নজর পড়েছে আন্তর্জাতিক ‘হায়েনা’দের। আর এই সুযোগে ঘরের ভেতরের মীরজাফরের প্রেতাত্মারাও যেন নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
বর্তমান বিশ্বরাজনীতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু এখন ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ অঞ্চল। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলের দাবার বোর্ডে বাংলাদেশ এখন পরাশক্তিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘গুটি’। এই ভূখণ্ডে নিজেদের আস্তানা গাড়তে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিশ্বরাজনীতির তিন পরাশক্তি—চীন, ভারত ও আমেরিকা।
পরাশক্তিদের এই আধিপত্য বিস্তারের খেলায় বাংলাদেশকে এক ভয়ংকর কৃত্রিম সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে উসকে দিয়ে বাংলাদেশকে একটি 'প্রক্সি ওয়ার' বা ছায়াযুদ্ধে জড়ানোর নানামুখী ফাঁদ পাতা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বমোড়ল আমেরিকার মূল নজর এখন বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দিকে। এই অঞ্চলে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি বা আস্তানা তৈরি করতে চায় ওয়াশিংটন, যেন এখান থেকে একাধারে বঙ্গোপসাগর নিয়ন্ত্রণ এবং চীনের ওপর সরাসরি নজরদারি চালানো যায়।
চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করার এই বিদেশী আকাঙ্ক্ষা আজ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে এক বিশাল ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ইতিহাস প্রমাণ করে, বহিঃশত্রু তখনই সফল হয় যখন ঘরের ভেতরে বিশ্বাসঘাতকরা পথ দেখায়। আজকের দিনেও যারা ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে বিদেশী শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়, তারা আসলে সেই ১৭৫৭ সালের মীরজাফরদেরই আধুনিক সংস্করণ।
পলাশীর আম্রকানন থেকে আজকের বঙ্গোপসাগর—ষড়যন্ত্রের রূপ বদলালেও চরিত্র বদলায়নি।
পরাশক্তিদের এই ত্রিমুখী টানাপোড়েনের মাঝে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে হলে বাংলাদেশকে অত্যন্ত চতুর ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখতে হবে।
কোনো অবস্থাতেই বিদেশী শক্তির পাতা ফাঁদে পা দিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব বা চট্টগ্রাম বন্দরের মতো কৌশলগত সম্পদ অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। কারণ, ইতিহাস মীরজাফরদের ক্ষমা করেনি, আধুনিক মীরজাফরদেরও করবে না।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

