:

নৌকা নেই, লড়াই বহুমুখী: ১২ ফেব্রুয়ারির মহাযজ্ঞ ঘিরে যা বলছে বিশ্ব গণমাধ্যম

top-news

১৬ বছর পর এক 'অপরিচিত' নির্বাচনের দোরগোড়ায় বাংলাদেশ। ব্যালট পেপারে নেই শেখ হাসিনার নাম, নেই আওয়ামী লীগের চিরচেনা 'নৌকা' প্রতীক। যে গোপালগঞ্জ ছিল ক্ষমতার অঘোষিত রাজধানী, সেখানে আজ অন্য দলের মিছিলে মুখর রাজপথ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট কি কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের নির্বাচন, না কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ডিএনএ বদলে দেওয়ার মিশন? আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের চুলচেরা বিশ্লেষণে উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট তাদের প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে 'The Great Reset' বা 'মহাপরিবর্তন' হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ নির্বাচনী দৌড় থেকে ছিটকে পড়ায় মাঠ এখন বিএনপির জন্য উন্মুক্ত মনে হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। ছাত্র আন্দোলনের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া 'জাতীয় নাগরিক কমিটি' এবং পুনর্গঠিত বাম ও ডানপন্থী দলগুলো তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশকে নিজেদের দিকে টানছে। ফলে বিএনপিকে এখন লড়তে হচ্ছে শুধু প্রতিপক্ষের সাথে নয়, বরং মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশার সাথেও।

রয়টার্স তাদের বিশেষ ফিচারে দেখিয়েছে, কীভাবে কয়েক দশকের রাজনৈতিক দুর্গগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। গোপালগঞ্জের ভোটাররা প্রথমবারের মতো ব্যালটে 'নৌকা' না পেয়ে কিছুটা বিভ্রান্ত হলেও, সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় অনেক সাবেক প্রভাবশালী নেতা। আল-জাজিরার ভাষায়, "এটি এমন এক নির্বাচন যেখানে প্রতীক নয়, বরং প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।"

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক সংস্থা আটলান্টিক কাউন্সিল এর মতে, এবারের নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে।

ভারত দীর্ঘদিনের বন্ধু আওয়ামী লীগকে ছাড়া বাংলাদেশের সাথে নতুন রসায়ন তৈরিতে কিছুটা ধীরগতিতে এগোচ্ছে দিল্লি।

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম তারা এই নির্বাচনকে দেখছে 'গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার' হিসেবে। তবে ইসলামপন্থী দলগুলোর উত্থান এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখা নিয়ে পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছে।

বিবিসি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কেবল সংসদ সদস্য নির্বাচনই হচ্ছে না, বরং একই দিনে 'জুলাই জাতীয় সনদ' বা সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে একটি রেফারেন্ডাম বা গণভোটও হতে পারে। এটি বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক ড. মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, "বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী সহিংসতা রোধ করা। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে যদি বিএনপি ও তার মিত্রদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুরু হয়, তবে তা নতুন গণতন্ত্রের জন্য শুভ হবে না।"


বিষয়বিস্তারিত তথ্য
ভোটের তারিখ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বৃহস্পতিবার)
ভোটের সময়সকাল ৭:৩০ থেকে বিকেল ৪:৩০ পর্যন্ত (টানা ৯ ঘণ্টা)
মোট ভোটারপ্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ (৪ শতাংশ নতুন তরুণ ভোটার)
নির্বাচনী আসন৩০০ (ব্যালটে ভোট গ্রহণ)
অংশগ্রহণকারী দল৫৬টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল
মোট প্রার্থী১,৯৮১ জন (স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৪৯ জন)
ব্যতিক্রমআওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠন স্থগিত/নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনে অনুপস্থিত।
বিশেষ বৈশিষ্ট্যএকই দিনে 'জুলাই জাতীয় সনদ' বা সংবিধান সংস্কারে গণভোট।

 ভোটের ময়দানে প্রধান তিন শক্তি

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) 
নেতৃত্বে  তারেক রহমান (চেয়ারম্যান) ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আসন সংখ্যা: রেকর্ড ২৮৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে দলটি।
স্লোগান: "সবার আগে বাংলাদেশ"।
অবস্থান: দীর্ঘ দেড় দশক পর ক্ষমতার সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার।

১১ দলীয় জোট (নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি) 

নেতৃত্বে ডাঃ শফিকুর রহমান (জামায়াত) এবং নাহিদ ইসলাম (এনসিপি)।
আসন সংখ্যা জামায়াত ২২৪টি আসনে এবং এনসিপি ৩২টি আসনে লড়ছে।
স্লোগান "নতুন চোখে বাংলাদেশ"।
অবস্থান: জুলাই বিপ্লবের চেতনা এবং ইসলামী মূল্যবোধকে পুঁজি করে বড় চমকের অপেক্ষায়।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (হাতপাখা) 


নেতৃত্বে  মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিম (পীর সাহেব চরমোনাই)।
আসন সংখ্যা ২৫৩টি আসনে প্রার্থী দিয়ে নীরবে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
অবস্থান গ্রাম পর্যায়ে বিশাল ভোটব্যাংক এই জোটের মূল শক্তি।

 নির্বাচনের ৩টি বড় চ্যালেঞ্জ 

সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ'অপারেশন ডেভিল হান্ট' এবং মব ভায়োলেন্সের আশঙ্কা।
ভোটার উপস্থিতি  আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে আসা বা না আসার প্রভাব।
গণভোটের ফলাফল সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে সাধারণ মানুষের রায় সরকারের জন্য বড় অগ্নিপরীক্ষা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *