‘চমক’ কাজে আসেনি: তলানিতে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 31 Jan, 2026
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করলেও বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) টানতে বড় ধরনের হোঁচট খাচ্ছে বাংলাদেশ। এমনকি পাকিস্তানের চেয়ে এক বিলিয়ন ডলার কম বিনিয়োগ এসেছে বাংলাদেশে।
বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) দ্বায়িত্বে সিঙ্গাপুর ফেরত তরুণ ব্যাংকার ও স্কাইডাইভার আশিক চৌধুরীকে এনে ‘চমক’ দেওয়া হলেও, গত ১৬ মাসে বিনিয়োগের গ্রাফ নিম্নমুখী।
যেখানে ভারত, ভিয়েতনাম এমনকি পাকিস্তানও বিদেশি বিনিয়োগে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ বা ইকুইটি ক্যাপিটাল গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান আশিক চৌধুরী।
স্কাই ডাইভিংয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়া এই তরুণ কর্মকর্তাকে নিয়ে প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও চীন সফর করেছেন এবং বেশ কিছু বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাত্র ৫৫ কোটি ডলারের নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ কম। এটি করোনার সময়কালের (২০২০-২১) বিনিয়োগের চেয়েও নিচে।
আশিক চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর বলেছিলেন, ২০২৫ সালের শুরু থেকেই বিনিয়োগে ‘উল্লেখযোগ্য উন্নতি’ দেখা যাবে, যার প্রতিফলন বাস্তবে দেখা যায়নি।
বাংলাদেশের যখন বিনিয়োগে খরা, তখন প্রতিযোগী দেশগুলো বাজিমাৎ করছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের চিত্রটি নিম্নরূপ: ভারত: ২৭ বিলিয়ন ডলার। ইন্দোনেশিয়া: ২১ বিলিয়ন ডলার। ভিয়েতনাম: ২০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ: ১.৫৩ বিলিয়ন ডলার। *পাকিস্তান:বাংলাদেশের চেয়ে ১ বিলিয়ন ডলার বেশি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তানও এফডিআই আহরণে বাংলাদেশকে টপকে গেছে।
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, শুধুমাত্র বিডার চেয়ারম্যান পরিবর্তন করে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। এর পেছনে কাঠামগত বেশ কিছু কারণ দায়ী:
১. জ্বালানি সংকট:গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তা জমি পেলেও সংযোগ পাচ্ছেন না।
২. ব্যবসার পরিবেশ: ‘ডুয়িং বিজনেস’ বা ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান হতাশাজনক। দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং শুল্কায়নে দীর্ঘসূত্রতা এখনো বড় বাধা।
৩. ঋণের উচ্চ সুদ: ঋণের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশে পৌঁছে যাওয়ায় এবং ডলার সংকটে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ১৯ শতাংশ কমে গেছে।
৪. রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা: অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নীতিমালার ধারাবাহিকতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা কাজ করছে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজবলেন, “আশা করেছিলাম ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নতিতে সাহসী সংস্কার হবে। তবে গত দেড় বছরে ছিটেফোঁটা যা সংস্কার হয়েছে, তা খুবই নগণ্য।”
অন্যদিকে সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানো-নামানোর সময় কমানো এবং ডিজিটালাইজেশনের অভাব ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
নতুন বিনিয়োগ তো আসছেই না, উল্টো বিদ্যমান অনেক ছোট-মাঝারি ও বড় কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। এফআইসিসিআই-এর সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগ তো দূরের কথা, বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
বিনিয়োগ কমার বিষয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী -কে বলেন, “গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী দেশে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি সাধারণত শূন্যে চলে যায়। আমাদের দেশে তা হয়নি, উল্টো বেড়েছে—এটি একটি মিরাকল। বিনিয়োগকারীদের আস্থায় কোনো ঘাটতি নেই, এখন প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।”
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেবল আশার বাণীতে চিঁড়ে ভিজবে না। গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান এবং সাহসী সংস্কার ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগের খরা কাটানো অসম্ভব। (তথ্য সুত্র: দৈনিক প্রথম আলো)
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

