:

নতুন রূপে জামায়াতের আত্মপ্রকাশ: শঙ্কা আর মিশ্র প্রতিক্রিয়া

top-news

রয়টার্স: দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় নির্বাচনী রাজনীতিতে নিষিদ্ধ থাকার পর এবং স্বাধীনতার বিরোধিতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পেছনে ফেলে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী নতুন রূপে আবির্ভূত হচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি যেমন নতুন সমর্থন অর্জন করছে, তেমনি মধ্যপন্থী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগও তৈরি করেছে।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পরপরই জামায়াত নিজেদের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় এবং রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে জামায়াত নিজেদের ‘দুর্নীতিমুক্ত’ ও ‘জনকল্যাণমুখী’ দল হিসেবে উপস্থাপন করছে।

জামায়াতের বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমান রয়টার্সকে বলেন,  “আমরা প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি নয়, কল্যাণমূলক রাজনীতি শুরু করেছি। জামায়াত ও তার সহযোগীরা যে গঠনমূলক রাজনীতি করছে, মানুষ তাতে আস্থা ও বিশ্বাস রাখবে।”

তিনি দলের সাম্প্রতিক কার্যক্রম, যেমন—ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, বন্যা দুর্গতদের ত্রাণ সহায়তা এবং আন্দোলনে নিহতদের (জাতিসংঘের হিসেবে প্রায় ১,৪০০ জন) পরিবারকে আর্থিক সহায়তার কথা উল্লেখ করেন।

ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক  ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI) পরিচালিত এক জরিপে জামায়াতকে দেশের অন্যতম “পছন্দনীয়” দল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে শীর্ষ স্থানের জন্য জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে।

তরুণ প্রজন্মের সাথে জোট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির জয়লাভ করে। পরবর্তীতে তারা হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের তরুণ নেতাদের গঠিত ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’ (NCP)-এর সাথে নির্বাচনী জোট গঠন করে।

প্রার্থী বণ্টন: দলটি ১৭৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছে, যার মধ্যে ৭৪টি আসন এনসিপি ও অন্যান্য মিত্রদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ইমেজ পরিবর্তন: প্রথমবারের মতো দলটি একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে, যা তাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া: 
জামায়াতের এই উত্থান নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষের একাংশ দলটিকে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে একটি নৈতিক বিকল্প হিসেবে দেখছেন। ঢাকার এক ডাব বিক্রেতা মোহাম্মদ জালাল বলেন, আমরা নতুন কিছু চাই, আর সেই নতুন বিকল্প হলো জামায়াত। তাদের ভাবমূর্তি পরিষ্কার।”

তবে নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে শঙ্কা প্রবল।

সংখ্যালঘু ভীতি: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সংখ্যালঘু নেতা বলেন, যদি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসে, তবে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের দিকে যেতে পারে। আজ আমি আমার জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত।”

নারীদের উদ্বেগ: নারীপক্ষের সদস্য শিরীন হক জামায়াতের প্রতিশ্রুতিকে নিছক “নির্বাচনী কৌশল” বলে অভিহিত করেছেন। আন্দোলনকারী ছাত্রী উমামা ফাতেমাও সন্দিহান, কারণ জামায়াত নেতাদের বক্তব্যে নারী স্বাধীনতা ও কর্মঘণ্টা নিয়ে পরস্পরবিরোধী মন্তব্য শোনা গেছে। ৩০০ আসনের মধ্যে কোনো নারী প্রার্থী না দেওয়াও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।


অতীত ও ভবিষ্যৎ নীতি

জামায়াতে ইসলামীর শিকড় ১৯৪০-এর দশকের প্যান-ইসলামিক আন্দোলনে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা এবং পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে শীর্ষ নেতাদের দণ্ড কার্যকর হওয়ার ইতিহাস দলটির সঙ্গে জড়িত। ২০১৩ সালে দলটির নিবন্ধন বাতিল করা হলেও গত বছর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দলটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের কথা বলছে। আমির শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকতে আগ্রহী নই। বরং সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চাই।” যদিও কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে মাজার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনায় দলটির দিকে অভিযোগের আঙুল উঠলেও, জামায়াতের মুখপাত্র আহসানুল মাহবুব জুবায়ের দাবি করেন, “ধর্মের নামে কোনো সহিংসতা বা অসহিষ্ণুতায় জামায়াত কখনো জড়িত ছিল না।”

নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, জামায়াতের এই ‘নতুন রূপ’ ভোটারদের কতটা আশ্বস্ত করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক মহলে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

এদিকে, জামায়াতের নির্বাচনী কার্যক্রম, জোটগঠন, আসন বিন্যাস নিয়ে এখন চুল ছেড়া বিশ্লষণ চলেছ। আর্ন্তজার্তিক গণমাধ্যম রয়টার্সের প্রকাশিত সংবাদ এবং জামায়ত-এনসিপি জোটের কার্যক্রম বিশ্লষণ তুলে ধরা হলো।

জামায়াত-এনসিপি জোট: নির্বাচনী মাঠের নতুন সমীকরণ ও প্রভাব বিশ্লেষণ
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ‘জামায়াতে ইসলামী’ এবং ২০২৪-এর আন্দোলনের ফসল তরুণদের দল ‘এনসিপি’র (NCP) এই জোট বাংলাদেশের প্রথাগত নির্বাচনী পাটিগণিতকে জটিল করে তুলেছে। দৃশ্যত বিপরীতমুখী মতাদর্শের (ইসলামপন্থী ও জেন-জি অ্যাক্টিভিস্ট) এই মিলনকে বিশ্লেষকরা কেবল নির্বাচনী কৌশল নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী ‘পাওয়ার শিফট’ বা ক্ষমতার পালাবদল হিসেবে দেখছেন।

 জোটের কৌশলগত  সুবিধা (Strategic Synergy)- এই জোট মূলত ‘বিনিময় নীতি’-র ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

জামায়াতের লাভ (ইমেজ রিব্র্যান্ডিং): জামায়াতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল তাদের ১৯৭১-এর ভূমিকা এবং ‘পুরোনো পন্থী’ দল হিসেবে তকমা। এনসিপি-র তরুণ ও আধুনিক নেতৃত্বের সাথে জোট বেধে তারা নিজেদের একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ ও ‘আগামীর দল’ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছে। এটি তাদের শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং নতুন ভোটারদের (First-time voters) কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।

এনসিপি-র লাভ (সাংগঠনিক শক্তি): এনসিপি-র জনপ্রিয়তা থাকলেও তাদের তৃণমূল পর্যায়ে ভোট কেন্দ্রে এজেন্ট দেওয়া বা গ্রাম পর্যায়ে ক্যাম্পেইন চালানোর মতো শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো নেই। জামায়াতের ক্যাডার-ভিত্তিক সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক শক্তি এনসিপি-র প্রার্থীদের মাঠ পর্যায়ে সুরক্ষা ও লজিস্টিক সাপোর্ট দেবে।

আসনভিত্তিক সমীকরণ ও সম্ভাব্য বণ্টনজামায়াত ঘোষণা করেছে তারা ১৭৯টি আসনে লড়বে এবং এর মধ্যে ৭৪টি আসন মিত্রদের (মূলত এনসিপি) ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকে একটি স্পষ্ট আসন বিন্যাস অনুমান করা যায়:

গ্রামীণ বনাম শহুরে বিভাজন (Rural vs. Urban Split)

জামায়াতের ফোকাস (গ্রামীণ জনপদ): জামায়াত তাদের ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটিগুলোতে (Strongholds) নিজেদের প্রার্থী রেখেছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, যশোর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম (দক্ষিণ ও উত্তর), কক্সবাজার এবং বগুড়ার আসনগুলোতে জামায়াত সরাসরি লড়বে।

এনসিপি-র ফোকাস (মেট্রোপলিটন ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা): ৭৪টি ছেড়ে দেওয়া আসনের অধিকাংশই হতে পারে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী এবং সিলেটের মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোতে। যেখানে তরুণ ভোটার এবং ভাসমান ভোটার (Floating Voters) বেশি, যারা প্রথাগত রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষ সমীকরণ 
চট্টগ্রামের গ্রামীণ আসনগুলোতে (যেমন: সাতকানিয়া-লোহাগাড়া, বাঁশখালী) জামায়াত তাদের নিজস্ব ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী দিয়েছে।

তবে চট্টগ্রাম শহরের আসনগুলোতে (কোতোয়ালি বা ডবলমুরিং) তারা এনসিপি-র কোনো তরুণ নেতা বা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিকে সমর্থন দিতে পারে, যাতে বিএনপি-র প্রার্থীর বিরুদ্ধে ‘অ-রাজনৈতিক’ ভোটগুলো টানা যায়।

 বিএনপির ওপর প্রভাব: সহজ জয়ে বাধা?
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর বিএনপি ধারণা করেছিল নির্বাচনটি তাদের জন্য ‘ওয়াক-ওভার’ হবে। কিন্তু এই জোট বিএনপিকে দুটি বড় চ্যালেঞ্জে ফেলেছে: 

(১) ভোট ব্যাংক বিভাজন: জামায়াত এবং বিএনপি উভয়েই ডানপন্থী ও রক্ষণশীল ভোটের দাবিদার। জামায়াত আলাদা জোট করায় বিএনপির নিশ্চিত ভোট ব্যাংকে বড় ধস নামার সম্ভাবনা রয়েছে।
 (২)তরুণ ভোট:  ২০২৪-এর বিপ্লবের পর তরুণরা বিএনপিকেও ‘পুরোনো ব্যবস্থা’র অংশ মনে করে। এনসিপি এই সেন্টিমেন্ট ব্যবহার করে তরুণ ভোটগুলো বিএনপির বাক্স থেকে সরিয়ে নিতে পারে।

 ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
এই জোটের সামনে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে:
 আদর্শিক সংঘাত: এনসিপি-র অনেক নেতা সেক্যুলার বা উদারপন্থী মানসিকতার। তৃণমূলের জামায়াত কর্মীরা একজন ‘জিন্স পরা’ তরুণ বা উদারপন্থী নারী প্রার্থীর জন্য কতটা আন্তরিকভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে সংশয় আছে।
সংখ্যালঘু ভোট:  এনসিপি-র কারণে জোটটি কিছুটা ‘সফট’ ইমেজ পেলেও, জামায়াতের মূল ব্র্যান্ডিংয়ের কারণে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ভোটাররা এই জোট থেকে দূরে থাকতে পারে, যা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসনগুলোতে নির্ণায়ক হতে পারে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যদি বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায় (Hung Parliament), তবে এই জামায়াত-এনসিপি জোট ‘কিংমেকার’ বা সরকার গঠনের চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারে। মাত্র ১০০-১২০টি আসন টার্গেট করে যদি তারা ৫০-৬০টি আসনও পায়, তবে সংসদে তারা প্রধান বিরোধী দল বা জোট সরকারের অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *