:

রক্তে ভেজা জঙ্গল সলিমপুর: পাহাড়ের ভাঁজে ভিন্ন এক বিভীষিকা

top-news

চট্টগ্রাম শহরের একেবারে কোল ঘেঁষে, বায়েজিদ বোস্তামী থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর। আপাতদৃষ্টিতে এটি সীতাকুণ্ডের অংশ মনে হলেও, কার্যত এটি যেন বাংলাদেশের ভেতরেই ‘অন্য এক দেশ’। নিজস্ব আইন, নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা এবং সশস্ত্র পাহারায় ঘেরা এই ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকাটি দীর্ঘ চার দশক ধরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ অভয়ারণ্য।

সর্বশেষ  সোমবার  অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে এখানে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন র‍্যাবের উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, জঙ্গল সলিমপুর কতটা ভয়ংকর ও অপ্রতিরোধ্য।
‘মিনি ক্যান্টনমেন্ট’ ও র‍্যাবের ওপর হামলা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেখানে নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা , সেখানে জঙ্গল সলিমপুরে উল্টো চিত্র দেখা যায়। সোমবার সন্ধ্যায় র‍্যাব–৭ এর একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। পাহাড়ের ওপর থেকে বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এই হামলায় প্রাণ হারান র‍্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন এবং আহত হন আরও তিনজন।

তবে এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০২২ সালেও র‍্যাবের সঙ্গে এখানে সন্ত্রাসীদের গুলিবিনিময় হয়। ২০২৩ সালে জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ওসিসহ ২০ জন হামলার শিকার হন। এমনকি পুলিশ বা প্রশাসনের গাড়ি এলাকায় ঢুকলেই পাহারাদারদের সংকেতে মুহূর্তের মধ্যে সশস্ত্র বাহিনী ঘিরে ফেলে তাদের।

চার দশকের দখলদারিত্ব ও ‘প্লট বাণিজ্য’
জঙ্গল সলিমপুরের এই সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয় নব্বই দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাসের হাত ধরে। সরকারি পাহাড় কেটে তিনি গড়ে তোলেন এক বিশাল বসতি। তার মৃত্যুর পর এই সাম্রাজ্যের হাল ধরে ইয়াসিন, কাজী মশিউর, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেকের মতো শীর্ষ সন্ত্রাসীরা।

দখল ও বাণিজ্যের ধরন:


ছিন্নমূল সাইনবোর্ড: ভূমিহীন ও ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসনের কথা বলে ‘আলীনগর বহুমুখী সমিতি’ ও ‘মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’ নামে সংগঠন তৈরি করা হয়।

নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে বিক্রি: সরকারি খাসজমি বা পাহাড় কেটে প্লট বানিয়ে তা স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। একেকটি প্লট ৫ থেকে ৩০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়।

টোকেন সিস্টেম: পাহাড় কাটার জন্য চালু রয়েছে ‘টোকেন সিস্টেম’। দৈনিক ৫০০ টাকার টোকেন কিনলে তবেই পাহাড় কাটার অনুমতি মেলে।

সেবা ও চাঁদা: অবৈধ বিদ্যুৎ, পানি ও বিচার সালিশের নামে বাসিন্দাদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হয়।

দুর্ভেদ্য দুর্গ: গেট, আইডি কার্ড ও নিজস্ব বাহিনী

জঙ্গল সলিমপুরকে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করা হয়েছে। এলাকাটির প্রবেশপথে রয়েছে লোহার বিশাল গেট।
কড়া নিরাপত্তা: বাসিন্দাদের জন্য রয়েছে বিশেষ পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড)। কার্ড ছাড়া কেউ ভেতরে ঢুকতে পারে না।
চেকপোস্ট: অপরিচিত কেউ ঢুকতে চাইলে পাহারাদাররা ইন্টারকম বা মোবাইলের মাধ্যমে ভেতরের নেতাদের জানিয়ে দেয়।
মানবঢাল: প্রশাসন অভিযানে গেলে নারী ও শিশুদের সামনে দাঁড় করিয়ে ‘মানবঢাল’ তৈরি করা হয়, আর পেছন থেকে সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়।

৫ আগস্ট পরবর্তী সংঘাত ও নতুন মেরুকরণ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের দখল নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে একাধিক গ্রুপ। আগে ইয়াসিন ও মশিউর বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও, বর্তমানে বিএনপি ও যুবদলের বহিষ্কৃত কিছু নেতার (যেমন রোকন উদ্দিন) মদদে নতুন করে দখলদারিত্বের চেষ্টা চলছে।

গত কয়েক মাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্তত চারজন খুন হয়েছেন। সম্প্রতি ৬০ লাখ টাকার অস্ত্র কেনার অডিও ফাঁস হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।   পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরাও এখানে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

সরকারি মহাপরিকল্পনা ও ব্যর্থতা


সরকার এই এলাকাটিকে সন্ত্রাসমুক্ত করে এখানে কারাগার, সাফারি পার্ক, আইটি পার্ক, স্পোর্টস ভিলেজ ও নভোথিয়েটারসহ ১১টি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বেদখল হওয়া এই ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।

কিন্তু বারবার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েও সন্ত্রাসীদের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে এসব পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখছে না। দিনের বেলা উচ্ছেদ করা হলেও রাতের আঁধারে আবার তা দখল হয়ে যায়। পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, কেবল বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে এই ‘রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্র’ পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত ও কঠোর যৌথ অভিযান।

র‍্যাব কর্মকর্তা নিহতের ঘটনা প্রমাণ করে, জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীরা এখন কতটা বেপরোয়া। পাহাড়ের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা এই অস্ত্র ও মাদকের সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে না পারলে চট্টগ্রাম নগরের নিরাপত্তা ও পরিবেশ—উভয়ই চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

এক নজরে জঙ্গল সলিমপুর সংকট

বিষয়                                                                                                বিবরণ
অবস্থান                                                     সীতাকুণ্ড (বায়েজিদ লিংক রোডের পাশে), চট্টগ্রাম
আয়তন                                                    প্রায় ৩,১০০ একর (সরকারি খাসজমি)
নিয়ন্ত্রণকারী                                            ইয়াসিন বাহিনী, মশিউর বাহিনী এবং অধুনা রোকন গ্রুপ
বাণিজ্য                                                      পাহাড় কেটে প্লট বিক্রি, অস্ত্র ব্যবসা, চাঁদাবাজি
নিরাপত্তা ঝুঁকি                                         র‍্যাব, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট ও সাংবাদিকদের ওপর নিয়মিত হামলা
উন্নয়ন পরিকল্পনা                                 সরকারি ১১টি প্রকল্প (বাস্তবায়ন থমকে আছে)

সরকার চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরের ৩,১০০ একর খাসজমি উদ্ধার করে সেখানে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা (Master Plan) বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। মূল লক্ষ্য ছিল এলাকাটিকে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মুক্ত করে একটি আধুনিক পরিবেশবান্ধব জনপদ, প্রশাসনিক হাব এবং পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর সেই পরিকল্পনা ফাইল বন্দি হয়ে পড়ে। গড়ে উঠে অপরাধীদের অভয়ারণ্য।

 বিগত সরকারের আমলে যেসব পরিকল্পনা নেয়া হয় সেগুলি হচ্ছে:
১. নাইট সাফারি পার্ক (Night Safari Park): এটি ছিল এই মহাপরিকল্পনার অন্যতম আকর্ষণীয় প্রকল্প।সিঙ্গাপুরের ‘মান্দাই নাইট সাফারি’র আদলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নাইট সাফারি পার্ক এটি। দিনের বেলা প্রাণীরা বিশ্রামে থাকবে এবং রাতে তাদের অবাধ বিচরণ দেখা যাবে। বিশেষ লাইটিং ও নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে পর্যটকরা জিপ বা সুরক্ষিত গাড়িতে করে রাতের বন্যপ্রাণী দেখতে পারতেন। প্রায় ৫৭ একর জায়গা জুড়ে এটি করার পরিকল্পনা ছিল।

২. চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার (Chittagong Central Jail): বর্তমান চট্টগ্রাম কারাগারের বন্দি ধারণক্ষমতার প্রচণ্ড সংকট কাটাতে এই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। একটি আধুনিক ও বিশাল ‘কারা কমপ্লেক্স’ নির্মাণ। এটি কেবল কারাগার নয়, বরং একটি ‘সংশোধনাগার’ (Correctional Facility) হিসেবে গড়ে তোলার কথা ছিল। এখানে বন্দিদের জন্য গার্মেন্টস কারখানা, মৎস্য চাষ এবং বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকার কথা, যাতে তারা মুক্তির পর দক্ষ জনশক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

৩. স্পোর্টস ভিলেজ (Sports Village):
আন্তর্জাতিক মানের খেলাধুলার সুবিধা সম্বলিত একটি ক্রীড়া পল্লী। এখানে ক্রিকেট ও ফুটবলের অনুশীলন মাঠ, ইনডোর গেমস কমপ্লেক্স এবং অ্যাথলেটদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা থাকার কথা। লক্ষ্য ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইভেন্টের জন্য ভেন্যু এবং অনুশীলনের সুযোগ তৈরি করা।

৪. আইকনিক মসজিদ (Iconic Mosque): ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মিশেলে দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীর একটি বিশাল মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা পর্যটকদের জন্যও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হবে।

৫. নভোথিয়েটার ও বিজ্ঞান কেন্দ্র (Novotheater):
শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক করতে এবং বিনোদনের জন্য একটি আধুনিক নভোথিয়েটার বা প্ল্যানেটোরিয়াম স্থাপন করার কথা ছিল।

৬. পাহাড় ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ রক্ষা কেন্দ্র:  জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড় কাটা রোধে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ‘বিভাগীয় পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি’র কার্যালয় এবং বন বিভাগের বিশেষ অফিস এখানে স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। এর সাথে একটি ‘বার্ড সাঙ্কচুয়ারি’ (পাখির অভয়ারণ্য) তৈরির কথাও ছিল।

৭. অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা:  সরকারের পরিকল্পনায় আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে রয়েছে,  তথ্য প্রযুক্তি পার্ক (IT Park): প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে।     উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র: বাংলাদেশ বেতারের জন্য।     হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল: উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল।  কাস্টমস ডাম্পিং হাউস: চট্টগ্রাম কাস্টমসের জব্দ করা পণ্য রাখার জন্য বিশাল গোডাউন বা ইয়ার্ড। নিরাপত্তা বাহিনীর স্থাপনা: র‍্যাব-৭ এর সদর দপ্তর বা স্থায়ী ক্যাম্প, পুলিশ লাইনস এবং আনসার ভিডিপি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

দুর্ভাগ্যবশত, এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পগুলোর অধিকাংশই এখন স্থবির অবস্থায় আছে। এর মূল কারণগুলো হলো:

ভূমি উদ্ধারে ব্যর্থতা: যদিও ২০২২ সালে জেলা প্রশাসন কিছু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছিল, কিন্তু সন্ত্রাসীদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পুরো ৩,১০০ একর জমি কখনোই পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসেনি। 

৫ আগস্ট পরবর্তী অস্থিতিশীলতা: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকাটি আবারও দখলদার ও সশস্ত্র বাহিনীর হাতে চলে গেছে। আগে যেখানে নির্দিষ্ট কিছু গডফাদার ছিল, এখন সেখানে নতুন নতুন গ্রুপ (যেমন রোকন গ্রুপ বনাম ইয়াসিন গ্রুপ) আধিপত্য বিস্তারে লিপ্ত।

নিরাপত্তা ঝুঁকি: সর্বশেষ র‍্যাব কর্মকর্তার নিহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, বর্তমানে সেখানে উন্নয়ন কাজ তো দূরের কথা, সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রবেশ করাই এখন জীবন-মরণ সমস্যা।

জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে সরকারের "মিনি সীতাকুণ্ড শহর" বা পর্যটন হাব করার যে ব্লু-প্রিন্ট ছিল, তা বর্তমানে সন্ত্রাস আর দখলের কারণে কার্যত একটি "কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ" স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

সন্ত্রাসীদের হাতে র‍্যাব কর্মকর্তার নিহত হওয়ার পর এখন সরকারকেরই সলিমপুরকে ঘিরে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে মনে করেছন সংশ্লিষ্টরা। এরফলে সলিমপুর একদিকে যেমন গড়ে উঠবে পর্যটন এলাকা হিসাবে অন্য দিকের সন্ত্রাসীদের দৌরত্ব কমে আসবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *