:

বাজার থেকে হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেছে এলপিজি: বাড়তি টাকা দিয়েও মিলছে না গ্যাস সিলিন্ডার

top-news

বাজার থেকে হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেছে এলপিজি। বাড়তি টাকা দিয়েও মিলছে না এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে বাড়তি টাকা। 

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) চলতি ডিসেম্বর মাসের জন্য প্রতি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ২৫৩ টাকা নির্ধারণ করলেও রাজধানীর বাজারে এর প্রতিফলন নেই। উল্টো নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

গত কয়েকদিন  বিভিন্ন এলাকায়  ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে প্রতি সিলিন্ডার এলপিজি ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। যদিও ভোক্তাদের সবসময়ই নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বাড়তি খরচ করতে হয়। তবে, এবারের মূল্যবৃদ্ধি পূর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। চড়া দামের পাশাপাশি বাজারের বিভিন্ন স্থানে এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র সংকটও দেখা দিয়েছে।

ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, শীতকালে স্বাভাবিকভাবে এলপিজির চাহিদা বাড়ে। কিন্তু সেই তুলনায় বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। চাহিদা ও জোগানের এই অসামঞ্জস্যের সুযোগ নিয়ে খুচরা পর্যায়ে দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

দেশের এলপিজি চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করে থাকে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। এলপিজি আমদানি ও বিপণনের জন্য বর্তমানে ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স থাকলেও বাজারে সক্রিয় রয়েছে  ২৮টির মতো কোম্পানি। এর মধ্যে বসুন্ধরা, যমুনা, বেক্সিমকো, মেঘনা (ফ্রেশ), ওমেরা ও বিএম এলপিজি উল্লেখযোগ্য।

এলপিজি সংকটের বিষয়ে  ফ্রেশ এলপি গ্যাসের এরিয়া সেলস ম্যানেজার মো. আফজাল  বলেন, এলপিজি মূলত আমদানিনির্ভর একটি পণ্য। সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি কমে যাওয়ার কারণে বাজারে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক কোম্পানির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

মূলত এলসি জটিলতার কারণে সাপ্লাই চেইনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যার ফলে সার্বিকভাবে এলপিজি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তবে আমরা আশা করছি, দ্রুত সংকট কেটে যাবে।

তবে কোনো ধরনের নতুন ঘোষণা ছাড়াই খোলা বাজারে হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ভোক্তারা।

ব্যবসায়ীদের দাবি, সময়মতো এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলতে না পারায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এলপিজি আমদানি করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে হঠাৎ করেই বাজারে তীব্র সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে এবং দাম বেড়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা  বলেন, বাড়তি মূল্য ও সংকটের বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও কথা বলেছি। তারা জানিয়েছে, এলসি খোলা হলেও ট্রেডার পর্যায় থেকে এলপিজির শিপমেন্ট আটকে আছে। কেন আটকে আছে এবং কীভাবে এর দ্রুত সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে কাজ করছি।

ডিসেম্বরে নির্ধারিত ১,২৫৩ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডার ১,৫০০-২,১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিশ্ববাজারে চাহিদা, জাহাজ সংকট ও ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়ায় ডিসেম্বরে আমদানি প্রায় ৪০% কমেছে। সরবরাহ ঘাটতি ও পরিবহন খরচ বাড়ায় কোম্পানিগুলোও বাড়তি দামে বিক্রি করছে। বিইআরসি লোয়াবকে নির্ধারিত দামে বিক্রির নির্দেশ দিলেও ক্যাব বলছে, বাজার নিয়ন্ত্রণে সংস্থাটির ব্যর্থতা স্পষ্ট।

প্রতি মাসে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ঘোষণা করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ডিসেম্বর মাসের ঘোষিত মূল্য অনুযায়ী ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ভোক্তা পর্যায়ে এক হাজার ২৫৩ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। নিয়ম অনুযায়ী, এই দাম আগামী ৪ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা। ওই দিন জানুয়ারি মাসের জন্য নতুন দাম ঘোষণা করবে বিইআরসি, যা ঘোষণা শেষে সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হবে।

৪ জানুয়ারি বিইআরসির নতুন দাম ঘোষণার কথা রয়েছে। বিইআরসি ও এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্র বলছে, শীতের সময় বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা বেড়ে যায়। এতে দামও কিছুটা বাড়তি থাকে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে এলপিজি আমদানির জাহাজসংকট।

নিয়মিত এলপিজি পরিবহনের ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে। পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। তারপরও চাইলেই জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আগের মাসের তুলনায় গত মাসে এলপিজি আমদানি কমে গেছে। প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়। ডিসেম্বরে আমদানি করা হয়েছে ৯০ হাজার টন। আমদানি খরচ বাড়ায় কিছু কোম্পানি কিছুটা বাড়তি দাম রাখতে পারে।

দাম বাড়ার বিষয়টিকে বিইআরসির ব্যর্থতা হিসেবে অভিহিত করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, এলপিজি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্রিটিক্যাল আইটেম। এজন্য সরকার এবং বিইআরসিকে এর ব্যবস্থাপনায় যথাযথ মনোযোগ দিতে হবে।

ড. ইজাজ হোসেন বলেন, দাম বেড়ে যাওয়া স্পষ্টভাবে বিইআরসির ব্যর্থতা। তাদের অবশ্যই খবর রাখা উচিত, সরবরাহে ঘাটতি হবে কি হবে না। এছাড়া অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা প্রয়োজন। তিনি যোগ করেন, বাড়তি দাম মোটেও কাম্য নয়—নির্ধারিত দাম অনুযায়ীই সিলিন্ডার বিক্রি করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *