:

সংস্কারের সন্তুষ্টির আড়ালে অর্থনৈতিক ধস: দারিদ্র্য ও মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষ

top-news

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা এখন মুখোমুখি এক কঠিন বাস্তবতার। একদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও কর্মসংস্থান হারানোর বেদনায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত। সাম্প্রতিক দুটি ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেদনে—একটি জনমত জরিপ এবং অন্যটি বিশ্বব্যাংক ও বিবিএস-এর অর্থনৈতিক তথ্যে—বাংলাদেশের এই দ্বিমুখী সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে।

কেমন আছে সাধারণ মানুষ?
সহজ কথায়, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভালো নেই। রাজনৈতিক পরিবর্তনের স্বস্তি থাকলেও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাদের কোণঠাসা করে ফেলেছে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মানুষ এখন ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি’ এবং ‘ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য’—এই দ্বিমুখী যাতাকলে পিষ্ট।

১. আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি: মূল্যস্ফীতির দংশন
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশে পৌঁছানোয় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের হেঁশেলে আগুন লেগেছে। টানা চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত তা ৯ শতাংশের ওপরে থাকার প্রাক্কলন সাধারণ মানুষের সঞ্চয় প্রায় নিঃশেষ করে দিয়েছে।

২. উল্টো পথে হাঁটছে দারিদ্র্য বিমোচন
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সাফল্য এখন হুমকির মুখে। গত চার বছর ধরে দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে।

ভয়াবহ পূর্বাভাস: ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
দরিদ্র মানুষের সংখ্যা: বর্তমানে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৬০ লাখ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে থাকা আরও বিশাল এক জনগোষ্ঠী যেকোনো সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মত: পিপিআরসি-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল সময়কালটি বাংলাদেশের জন্য ‘উল্টো ঘুরে যাওয়ার’ সময়কাল।

৩. কর্মসংস্থান সংকট: বেকারত্বের মিছিল
অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কর্মসংস্থানে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে:
*   ২০২৩-২৪ সালে প্রায় ২০ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে।
*   ২০২৫ সালে আরও ৮ লাখ কর্মসংস্থান কমার আশঙ্কা রয়েছে।
*   চাকরি হারানোর এই মিছিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও তরুণ সমাজ। নতুন কর্মসংস্থান যা তৈরি হচ্ছে, তার ৬৩ শতাংশই কৃষি খাতে, যেখানে আয় তুলনামূলক কম। শহরের শোভন কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়েছে।

৪. সংস্কার কার্যক্রম: সন্তুষ্টি বনাম হতাশা
অর্থনৈতিক এই করুণ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রিয়তায়। প্রথম আলোর জরিপ অনুযায়ী:
সন্তুষ্টি: সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে ৪১.৪ শতাংশ মানুষ সন্তুষ্ট।
অসন্তুষ্টি: ৩৬.৮ শতাংশ মানুষ অসন্তুষ্ট বা সন্তুষ্ট নন।
ব্যর্থতার জায়গা: জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেকের বেশি মনে করেন পুলিশ (৫৮%), বিচারব্যবস্থা (৫৬%), প্রশাসন (৫৬%) এবং আর্থিক খাত (৫২%) সংস্কারে সরকার সফল হতে পারেনি।

বিশেষ করে আর্থিক খাতের সংস্কারে ব্যর্থতার (৫২%) যে চিত্র জরিপে উঠে এসেছে, তার সাথে বিবিএস ও বিশ্বব্যাংকের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির তথ্যের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। মানুষ যখন বাজারে গিয়ে স্বস্তি পায় না, তখন আর্থিক খাতের সংস্কার তাদের কাছে অর্থহীন মনে হওয়া স্বাভাবিক।

৫. বৈষম্য ও অব্যবস্থাপনা
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক করুণ চিত্র—সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা গরিবদের চেয়ে ধনীরাই বেশি পাচ্ছে। সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের মাত্র অর্ধেক সরকারি সহায়তা পায়, অথচ সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের ৩৫ শতাংশই এই সুবিধা ভোগ করছে। এটি প্রমাণ করে যে, শুধু অর্থের অভাব নয়, সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতি সাধারণ মানুষের দুর্দশা বাড়াচ্ছ।

সফলতা ও ব্যর্থতার খতিয়ান

জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। কিন্তু জরিপ ও অর্থনৈতিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্বাদ পেলেও অর্থনৈতিক মুক্তি মেলেনি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থান সংকোচন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় জনমনে হতাশা দানা বাঁধছে।

সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—দ্রুততম সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। জরিপে উঠে আসা পুলিশ ও প্রশাসনের সংস্কারে ধীরগতি এবং আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা দূর করতে না পারলে, রাজনৈতিক সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে না। সাধারণ মানুষ ‘পরিসংখ্যান’ বোঝে না, তারা বোঝে বাজারের থলি আর মাস শেষের সঞ্চয়—যেখানে তারা এখন চরমভাবে পরাজিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *