:

বিক্রী হয়ে গেল দেড়শ’ বছরের পুরানো ডা: খাস্তগীর স্কুলের খেলার মাঠ! নাগরিকদের ক্ষোভ

top-news

ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলায় অবস্থিত একটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়। এটি চট্টগ্রামের প্রাচীনতম এবং অন্যতম প্রথম বালিকা বিদ্যালয়। ২০২৪ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসাবে নির্বাচিত হয়।

উনিশ শতকের ব্রাহ্ম আন্দোলনের অন্যতম নেতা অন্নদাচরণ খাস্তগীর ১৮৭৮ সালে চট্টগ্রামের বর্তমান জামাল খান সড়কে একটি ভার্নাকুলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর অন্নদাচরণের জামাতা, চট্টগ্রামের সামাজিক আন্দোলনের পথিকৃৎ যাত্রামোহন সেন তার স্মৃতি রক্ষার জন্যে স্কুলটিকে ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত করার লক্ষে একটি বিদ্যালয় নির্মাণ করেন। বিংশ শতকের শুরুর দিকে ১৯০৭ সালে তিনি এই বিদ্যালয়কে জমি ও ভবন দান করেন এবং নাম দেয়া হয় অন্নদাচরণ খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। 

ওই বছরই বিদ্যালয়টিকে সরকারী বিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যিনি ডঃ খাস্তগীরের তৃতীয় কন্যা বিনোদিনীকে বিয়ে করেছিলেন, ১৯০৭ সালে এই স্কুলটি এককভাবে মেয়েদের জন্য তৈরি করেছিলেন এবং এটি নামকরণ করেন খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয়। ১৯০৬ সালে বিনোদিনী তার শ^শুর বাড়িতে মারা যান। এর পর জেএম সেন এটিকে একটি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে উন্নীত করার জন্য সাত একর জমি এবং একটি বিল্ডিং অনুদান দিয়ে ছিলেন, পরে এটি সরকার কর্তৃক অনুমোদন পাওয়ার পর ডঃ খাস্তগীর সরকারি উচ্চ ইংলিশ স্কুল গার্লস হিসাবে নামকরণ করে কার্যক্রম শুরু করে।  পরবর্তীতে স্কুলটিতে বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। । মাত্র তিন জন শিক্ষার্থী (আন্না সেন, প্রেম কুসুম এবং জুনি) নিয়ে যাত্রা শুরু করে স্কুলটি এখন চট্টগ্রামসহ সারা দেশের মেয়েদের শিক্ষার অন্যতম প্রধান বিদ্যাপিট হিসাবে পরিচিতি অর্জন করেছে। 

বিট্রিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, বিখ্যাত উপন্যাসিক মৈত্রেয়ী দেবী, ভারতীয় বিজ্ঞানী শোভনা ধরের মত বিখ্যাতরা স্কুলটির শিক্ষার্থী ছিলেন।

প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরোনো এই বিদ্যাপীটের শত কোটি টাকার সম্পত্তির উপর লোলপ দৃষ্টি পড়েছে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির। ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসন এবং সাব রেজিষ্ট্রি অফিসের দুনীর্তিবাজ চক্রের যোগসাজসে স্কুলটির সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্কুল বাউন্ডারির ভিতরে থাকা বিশাল খেলার মাঠটি জনৈক জজ পল মালিকানা দাবি করে  ২০০৬ সালের জনৈক সমীর সেনকে পাওয়ার অব এর্টনী দেয়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জন্ম সনদ অনুযায়ী জজ পর্ল এর উত্তরাধিকার হচ্ছে বার্নান পাল। ১১/১২/২০১১ তারিখে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১৩ নং ওয়ার্ড থেকে  ইস্যু করা হলেও অনলাইনে এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ওই ওয়ার্ডের মহিলা কমিশনার লুৎফুন্নেছা দোভাষ (যিনি ৩৩,৩৪,৩৫ সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কমিশনার) ১৯/১২/২০১১ সালে জজ পালের মৃত্যুর সনদ ইস্যু করে জানান, জজ পাল ০৮/০৪/২০০৪ সালে মৃত্যু বরণ করেন। অথচ এর এক সাপ্তাহ আগে ১২/১২/২০১১ তারিখে ওই মহিলা কমিশনার ওয়ারিশ সনদ ইস্যু করেন। এতে জর্জ পালের স্ত্রী স্কলাষ্টিকা পালের মৃত্যুর কথা জানিয়ে একমাত্র জুবু পাল ওরফে এ্যাসমা পাল ওয়ারিশ রেখে যান বলে সনদ প্রদান করেন।  এ্কই দিন ইস্যুকৃত আরেক ওয়ারিশান সনদে জবু পালের মৃত্যু কথা জানিয়ে স্ত্রী সুধীয় পাল এবং পত্র জর্জ পাল ওরফে জুডিশ পাল ওয়ারিশ রেখে যাওয়া কথা জানিয়ে সনদ প্রদান করেন। সেই সনদে আবার সুধীয় পাল ও জজ পালের মৃত্যুতে বার্নান পল নামে একপুত্র ওয়ারিশ হিসাবে রেখে যাওয়া কথা জানান।

বার্নান পল নামজারি নথিতে যে জাতীয় পরিচয়পত্রের যে কপি জমা দেন তাতে ব্যাপক জালিয়াতির আশ্রয় নেন। তার দাখিল কৃত জাতীয় পরিচয় পত্রের নাম্বার হচ্ছে, ০৬১০৭৮৮৫২০২৫২। নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, উক্ত নাম্বারের পরিচয়পত্রটি হচ্ছে বরিশালের পিটার ড্যানলেজ গোমেজের।  তার পিতার নাম নরবার্ট গোমেজ, মাতার নাম তেরেজা গোমেজ। তার ঠিকানা হচ্ছে, বরিশারেল বাকেরগঞ্জ উপজেলার পাদ্রীশিবর ইউনিয়নে। বাড়ির নাম বিশাই বাড়ি।

এদিকে, জজ পল থেকে পাওয়ার অব এর্টনী মুলে সমীর সেন স্কুলের খেলার মাঠটির মালিকানা দাবি করে  ০ দশমিক ৩০৮১ একর বা ১৫গন্ডা এক কড়ার খেলার মাঠটি জনৈক ইঞ্জিনিয়ার অরিফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির কাছে ৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় বিক্রী করে দেন।

বেআইনি ভাবে বিক্রী হওয়া স্কুল মাঠটি এখনো স্কুল কর্তৃপক্ষ দখলে রেখেছে বলে জানান প্রধান শিক্ষক  শাহেদা আক্তার। তিনি জানিয়েছেন, স্কুলের মাঠটি রক্ষায় আইনি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। 

এদিকে, সরকারি স্কুলের জায়গা ব্যক্তি মালিকানায় চলে যাওয়া এবং জায়গাটি ক্রয়-বিক্রয়ের ঘটনায় সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। তারা অবিলম্বে ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন।

স্কুলের দখলে থাকা খেলার মাঠটি গোপনে বিক্রী হয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট  বাকলিয়া ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার মাসুমা আক্তার কনা জানিয়েছেন, স্কুলের মাঠ কিনে জনৈক ইঞ্জিনিয়ার আরিফুল ইসলাম নামজারির জন্য আবেদন করেন। তাঁর সে আবেদন খারিজ করে দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। 

প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ঐহিত্যবাহী স্কুলটির সম্পত্তি রক্ষায় জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কে আরো উদ্যোগী হওয়ার পাশাপাশি ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী চট্টগ্রামবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *